বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি ভাতা দ্বিগুণ হচ্ছে

বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যাঁরা ভাতা পাচ্ছেন তাঁদের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতাও দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে মুক্তিযোদ্ধারা আগামী অর্থবছর থেকে দ্বিগুণ হারে ভাতা পাবেন। দেশে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা পাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে যাঁরা দুস্থ বা যাঁদের বয়স বর্তমানে ৬৫ বছরের ওপরে তাঁরা আগামী অর্থবছরের শুরু থেকে পাবেন মাসে ১০ হাজার টাকা করে।

02_224705সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতের বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যমান ভাতার পরিমাণ ঠিক রেখে উপকারভোগীর সংখ্যা আরো পাঁচ লাখ বাড়ানোরও চিন্তা-ভাবনা রয়েছে সরকারের। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে আসন্ন বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া স্বামী পরিত্যক্ত বলে কথিতরা এখন থেকে সরকারি খাতায় পরিচিত হবেন নিগৃহীত নারী হিসেবে।

সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সামাজিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী এবং নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি কালের কণ্ঠকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দ্বিগুণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্যান্য খাতেও ভাতার পরিমাণ ঠিক রেখে উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বয়স্ক ভাতা ও অতিদরিদ্রদের জন্য প্রদত্ত ভিজিডি প্রাপ্তদের সংখ্যাও ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ইচ্ছায় সরকার সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অতিদরিদ্র মহিলাদের জন্য আরো কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু, খাদ্য, ত্রাণ ও দুর্যোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ ২২ মন্ত্রণালয় ও সংস্থা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নামে বর্তমানে ১৪৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার তার প্রথম মেয়াদে ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করেছিল। গত অর্থবছরের বাজেটে ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী’ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা মোট জিডিপির ২.৩ শতাংশ।

জানা গেছে, আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানোর বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে ‘উপকারভোগী’র সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ভাতা বাড়ানোর চাপ ছিল অর্থমন্ত্রীর ওপর, তবে ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব নাকচ করে দেন তিনি।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র চূড়ান্তকরণ’ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিশ্চিত করার ওপর তাগিদ দিয়েছেন। ২০২১ সালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হচ্ছে। তিন ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে ২০১৫ থেকে ২০২০, দ্বিতীয় ধাপে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল এবং এর পরবর্তী পর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে তৃতীয় ধাপ। কৌশলপত্রের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম বছর অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ‘উপকারভোগী’র সংখ্যা ৪২ লাখ ১৫ হাজার। আসন্ন বাজেটে এই সংখ্যা ১০ থেকে ২০ ভাগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

এ ছাড়া আসন্ন বাজেটে প্রতিবন্ধী, দলিত, ভিক্ষুকদের জন্যও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সমাজে উপেক্ষিত অবহেলিত তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিদের (হিজড়া) জন্য চাকরি ও অন্যান্য উদ্যোগের মাধ্যমে পুনর্বাসিত করার চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। আসন্ন বাজেটে তাদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রাফিক পুলিশ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেওয়ার ব্যাপারেও আলোচনা চলছে। যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে সরকার। বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশে নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত হিজড়া, বেদে শ্রেণি, দরিদ্র ক্যান্সার রোগী ও চা শ্রমিক- এই চার শ্রেণিকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে তাদের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। আগামী বাজেটে এই সংখ্যা আরো ২০ হাজার বাড়ানো হচ্ছে।

জানা গেছে, বর্তমান সরকার হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান এবং বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ভাতা, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, হিজড়াদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজের স্বাভাবিক ধারায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে হিজড়া শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও কর্মক্ষম হিজড়াদের আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ দিতে ও তাদের জীবনমান উন্নয়নে এর আগে বাজেট ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। পাইলট কার্যক্রমের আওতায় সাতটি জেলায় কর্মসূচি পরিচালিত হয়। আগামী অর্থবছরে আরো ১৪টি জেলাকে কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। ৩০০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা উপবৃত্তি ও ৩৫০ জন কর্মক্ষম হিজড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে হিজড়াদের স্বতন্ত্র লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বর্তমানে দেশে বসবাসরত হিজড়ার সংখ্যা প্রায় এক লাখের ওপরে।

জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি কালের কণ্ঠকে বলেন, হিজড়াদের সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার তাদের সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছে। এবার তাদের দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানেরও চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, হিজড়াদের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশে চাকরি দেওয়ার বিষয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে আলোচনা হয়েছে।

আরও পড়ুন