ভারত থেকে আসা অবৈধ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্যের নিরাপদ বাহন ট্রেন। উত্তরাঞ্চলের ছয় জেলায় অবাধে ট্রেনের মাধ্যমে আসার পর এগুলো ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। আর এ কাজে অস্ত্র ও মাদক চোরাকারবারিদের সহায়তা দিচ্ছে আইনশৃংখলা বাহিনীর কিছু সদস্যও। ৭১ জন অস্ত্র, মাদক ও চোরাকারবারিকে তাদের অবৈধ কাজের বিষয়ে নিরাপত্তা দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার জিআরপি থানা পুলিশের ৩৯ সদস্য।
চোরাকারবারিদের কাছ থেকে হিস্যা বুঝে নিতে রেল পুলিশের ওই সদস্যরা আবার নিয়োগ দিয়েছেন ১৩ জন লাইনম্যান (দালাল)। যারা ট্রেনে অস্ত্র ও মাদক বহনকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা উঠায়। এমনকি ভারতীয় চোরাকারবারিদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে এদেশের আরও ৬ ব্যক্তি। সম্প্রতি এসব অপরাধকর্মে জড়িত ১২৯ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে তাদের নাম-ঠিকানা সংবলিত একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। ওই প্রতিবেদনের আলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে বলেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়- সম্প্রতি দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, নীলফামারী, বগুড়া, জয়পুরহাট, নাটোর ও পাবনা জেলায় বিভিন্ন ট্রেনের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। অবৈধ অস্ত্র ও মাদক বহনকারীরা জিআরপি থানা পুলিশ ও রেল নিরাপত্তা বিভাগের কিছু অসৎ সদস্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় ভারত থেকে আনা অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও চোরাই পণ্য ট্রেনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছে।
আর এসবের বাহন হল- তিতুমীর, বরেন্দ্র, উত্তরা, সীমান্ত, রূপসা, নীলসাগর, দ্রুতযান ও তিস্তা নামক আন্তঃনগর ট্রেন। যাতে করে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক বিরামপুর, ফুলবাড়ী, শান্তাহার, নাটোর, ঈশ্বরদী ও হিলি রেলস্টেশনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। আর সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় চোরাকারবারিদেও এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে এদেশের কিছু অসৎ ব্যক্তি।
অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের সঙ্গে সমাজের শান্তি-শৃংখলা ও নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রেনে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক আসা বন্ধ করতে হবে। নইলে সামাজিক শান্তি-শৃংখলা বিনষ্টের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
চারটি সুপারিশ সংবলিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়- চিহ্নিত অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া; ট্রেন ও স্টেশনগুলোতে রেল পুলিশের পাশাপাশি র্যাব মোতায়েন করা। এসব জিআরপি থানায় অপেক্ষাকৃত সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী পদায়ন করে যারা অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এছাড়া ট্রেন ও রেলস্টেশনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
অস্ত্র ও মাদক চোরাকারবারে অভিযুক্ত যারা : প্রতিবেদনে ৬ জেলায় মোট ৭১ জন অস্ত্র ও মাদক চোরাকারবারিকে চিহ্নিত করা হয়; যারা ট্রেনে এসব অবৈধ পণ্য বহন করে থাকে। এদের মধ্যে ৩৭ জন দিনাজপুরের, নীলফামারীর ৯ জন, নাটোরের ৯ জন, বগুড়ার ৮ জন, জয়পুরহাটের ৫ জন ও পাবনার ৩ জন। চোরাকারবারিদের এই তালিকায় দিনাজপুরের হাকিমপুর থানার দুই ইউপি সদস্যের নাম রয়েছে। তারা হলেন খট্টা মাধবপাড়া ইউনিয়নের আবদুর রউফ মেম্বার ও আনিছুল ইসলাম। তবে তারা দুজনই মোবাইল ফোনে নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকমকে জানিয়েছেন, তারা এসব কাজে যুক্ত নন। বিএনপির রাজনীতি করেন বলে এ অপবাদ দেয়া হয়েছে। অন্যরা হলেন দক্ষিণ বাসুদেবপুর চুরিপট্টির মঞ্জুর আলম ও গিয়াস উদ্দিন, নবানু মণ্ডলের জামাতা বয়েজ উদ্দিন, নওদাপাড়ার শরিফুল ও ভুট্টু, মাঠপাড়ার অসিমুদ্দিনের জামাতা জাহাঙ্গীর, নয়াপাড়ার মাহমুদুল ইসলাম, বাগমারার তোজাম্মেল হক তোজা, মধ্যবাসুদেবপুর রেল কলোনির সোলায়মান আলী ও লোকমান আলী, দক্ষিণ বাসুদেবপুর ক্যাম্পপাড়ার আসমান আলী ওরফে আসমান ঠসা, সাতকুড়ির মশিউর রহমান, জাকির হোসেন ও আশরাফ আলী।
এছাড়া মাদক বহন করে থাকে মধ্যবাসুদেবপুরের পল্লব ও আলমগীর সরদার, দক্ষিণ বাসুদেবপুর চুরিপট্টির আকতার হোসেন, রবিউল ইসলাম, নূর এ আলম, রানা, কুদ্দুস, সিরাজুল ইসলাম, এজাজুল হক, উজ্জ্বল, রাশেদ আলী, স্বপন মিয়া, সোহাগ, মংলা গ্রামের মুকুল, জাহাঙ্গীর ও বাবুল, সাতকুড়ি গ্রামের হামিদুল ইসলাম, নন্দীপুরের আবু বক্কর, রায়ভাগের মিজু ও ঘাসুরিয়ার খোকন। জয়পুরহাটের পাঁচবিবির ভুইডোবা গ্রামের মমতাজ মিয়া, আনোয়ার হোসেন, হানিফ, হরিহরপুর গ্রামের শিউলি বেগম ও আম্বিয়া খাতুন।
নাটোরের অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের নামের তালিকায় নাটোর পৌরসভার দুই কাউন্সিলরের নাম রয়েছে। এর একজন হলেন ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমান মাসুম। যিনি জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক। অন্যজন হলেন ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সোহাগ। যিনি জেলা জাতীয়তাবাদী যুবদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। সোহাগ এ বিষয়ে বলেন, বিরোধী দলের রাজনীতি করি বলে এ ধরনের তালিকায় নাম দেয়া হয়েছে। সত্যিকারের অপরাধ করলে এতদিন পদ হারিয়ে জেলে থাকতে হতো। এছাড়া রয়েছেন নাটোর সদরের কানাইখালী জেলেপাড়ার বকুল সরকার, পটুয়াপাড়ার আফজাল শেখ গোপাল, চৌধুরী বড়গাছার কাজী সেলিম ও মেকার মাসুদ, আলাইপুরের পিপরু এবং হাফরাস্তার মিলন ও কুলসুম।
বগুড়ায় যারা অবৈধ পণ্য চোরাচালানির সঙ্গে যুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন তারা হলেন আদমদীঘি উপজেলার সান্দিরা গ্রামের শফিকুল ওরফে কালু, বাদশা, মালসন গ্রামের রবিন, দমদমা গ্রামের খাইরুল, সেউজগাড়ি গ্রামের শিপলু, নিশিন্দারা গ্রামের বুলবুল (মিনি ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক), চক সূত্রাপুর গ্রামের রাহাত ও মনি।
নীলফামারী জেলায় চোরাকারবারে জড়িতরা হলেন- সৈয়দপুর উপজেলার মিস্ত্রিপাড়া বটতলার বালতি যাবেদ, কয়াগোলাইট গ্রামের সোহেল ও বাবু, সাহেবপাড়ার বেবিয়া, ঘোড়াঘাটের জাবিদ, নিউ বাবুপাড়ার ভোলা মাহমুদ, ঢেলাপীর আবাসনের মিলন, রসুলপুর সুইপার কলোনির নুরু মিয়া ও লক্ষণপুর মণ্ডলপাড়ার হাসান আলী। পাবনা জেলায় জড়িত ৩ জন হলেন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নুরনগর গ্রামের মো. কালাম, ঈশ্বরদী উপজেলার ফতে মোহাম্মদপুরের হেকমত আলী ও দামুরহুদা উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের তহুরা বেগম।
আইনশৃংখলা বাহিনীর যারা জড়িত : ট্রেনে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানে সহযোগিতা করেন জিআরপি থানার কিছু কর্মকর্তা ও রেল নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য। এরা হলেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম লুৎফর রহমান, এসআই নিয়ামুল, আবদুল হান্নান, এএসআই মো. বেলাল, দেলোয়ার, বগুড়ার শান্তাহার জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাঈদ ইকবাল ও হাবিলদার লিয়াকত হোসেন, বগুড়ার জিআরপি ফাঁড়ির উপপরিদর্শক বিমল চন্দ্র, নীলফামারী জিআরপি থানার হাবিলদার নেনু মণ্ডল (ব্যাচ নং ২০৭), এএসআই বাবুল শেখ (ব্যাচ নং ৪২৪), সৈয়দপুর জিআরপি থানার হাবিলদার আবদুল বারী, আতাকুল ইসলাম ও রেজাউল ইসলাম।
এছাড়া বিভিন্ন জিআরপি থানার ২৬ জন কনস্টেবল নানাভাবে চোরাচালানে সহযোগিতা করে থাকেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তাদের হয়ে চোরাই পণ্যবহনকারীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার কাজে নিয়োজিত ১৩ জন লাইনম্যান (দালাল) হলেন পার্বতীপুর উপজেলার মোজাফফরনগর গ্রামের আবদুল মান্নান, সুন্দরীপাড়ার মোশারফ হোসেন মশা, ধুপিপাড়ার পিচ্ছি কালাম, বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার শান্তাহারের রুহুল ঢালী, নাটোরের উত্তর বড়গাছা জলার পাড়ের শাহাদত হোসেন ওরফে জন্ডিস, নাটোর স্টেশনের রফিক ও শফিকুল ইসলাম, বিরামপুর থানার জাবেদ হোসেন ও ভোলা, জয়পুরহাটের এনামুল ও কামাল হোসেন, সৈয়দপুরের আবদুল কাদের খান ও রাজু মিয়া।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- ভারতীয় চোরাকারবারিদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন বাংলাদেশের ৬ ব্যক্তি। এরা হলেন ঢাকার বাড্ডার আরশিনগরের ৩৭/এ মোবারক হোসেনের ছেলে মো. সোহেল হোসেন (৩৪), দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার দক্ষিণ বাসুদেবপুর চুরিপট্টির মঞ্জুর আলম, নওদাপাড়ার শরিফুল, মাঠপাড়ার অসিমুদ্দিনের জামাতা জাহাঙ্গীর, নয়াপাড়ার মাহমুদুল ইসলাম ও বাগমারার তোজাম্মেল হক তোজা।
বিশেষ প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


