
বিশ্ব ফুটবল যখন সমর্থকদের জোয়ারে ভাসছে, তখন বাংলাদেশের ফুটবলে চলছে প্রচণ্ড সমর্থকখরা। ফুটবলের মাঠে এখন আর দর্শকরা ভিড় করে না। ফুটবল ফেডারেশন, লীগ কমিটি কিংবা রেফারির অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সমর্থকদের বিক্ষোভের ঢেউ দেখা যায় না। অথচ একটি সময় ছিল, প্রিয় দলের ম্যাচ দেখার জন্য সমর্থকরা আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করত। আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ হলে তো কথাই নেই। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাসের সঙ্গে সমর্থকদের মিতালী ছিল বেশ পুরনো। এখন পুলিশ গ্যালারিতে থাকে, অথচ সমর্থকরা উধাও হয়ে গেছে। বাংলাদেশের দুই বড় ক্লাব আবাহনী ও মোহামেডানের জৌলুস এখন আর নেই। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যাচ্ছে তাদের অতীত ঐতিহ্য আর ইতিহাস। আবাহনী ও মোহামেডানের জায়গা দখল করে নিয়েছে শেখ রাসেল, শেখ জামাল আর মুক্তিযোদ্ধারা। অথচ কি গৌরবটাই না ছিল আবাহনী-মোহামেডানের সমর্থকদের। তবে একটি কথা ঠিক যে, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলেরও সমর্থক গড়ে ওঠেনি। তাদের কর্মকর্তারাই তাদের সমর্থক।
১৯৭৭ সালে মোহামেডান সমর্থক দলের পথচলা শুরু হয়েছিল। বুয়েটের তৎকালীন ছাত্র ড. নিজাম আহমেদসহ কয়েকজন ছাত্র মিলে মোহামেডান ফ্যান ক্লাব গড়ে তোলে। তাদেরই হাত ধরে ১৯৭৯ সালে মোহামেডান সমর্থক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ওই বছর এনায়েতকে বহিষ্কারাদেশকে ঘিরে সমর্থকরা একজোট হয়। আবদুল বাতেন সরকারকে সভাপতি করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়েছিল মোহামেডান সমর্থক দলের। সেই সমর্থক দল ভেঙে পরবর্তী সময়ে আমরা মোহামেডান ও মোহামেডান ফ্রেন্ডস নামে আরও দুটি সংগঠনের উৎপত্তি হয়। সাদা-কালোদের নানা সংকটের সময় সমর্থকরা বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৬ সালে মিরপুরে আবাহনী ও মোহামেডান ম্যাচে সহিংস ঘটনায় প্রাণ হারান দিপক কুমার নন্দী। মোহামেডান সমর্থক দল তার পরিবারকে একটি সেলাই মেশিন ও পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিল। সমর্থক দলের এক সক্রিয় সদস্য ছিলেন পচা শরীফ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্লাবের কর্মচারী হিসেবে কর্মরত। শরীফের নামের আগে পচা শব্দটি বসার পেছনে একটি মজার ঘটনা রয়েছে। ১৯৭৫ সালে নওশের, শরিফ ও আরিফ নামে তিনভাই একসঙ্গে মোহামেডানে খেলতেন। কেউ ফুটবলার শরিফকে ডাকলে সাড়া দিতেন সমর্থক শরিফ। তখন এই বিড়ম্বনার হাত থেকে বাঁচার জন্য ক্লাবের লোকজন সমর্থক শরিফের নামের আগে পচা লাগিয়ে দেয়। সেই থেকে তার নাম পচা শরিফ।
১৯৭৮ সালে আবাহনীর সাত ফুটবলারকে সাসপেন্ড করার মধ্য দিয়ে জন্ম হয় আবাহনী সমর্থকগোষ্ঠীর। ওই ঘটনার পর আবাহনীর একটি ক্রিকেট ম্যাচে কয়েকজন সমর্থক বুকে কালো ব্যাজ লাগিয়ে ফুটবলারদের সাসপেনশন প্রত্যাহারের দাবিতে স্লোগান দেন। ধীরে ধীরে সমর্থকরা সংগঠিত হতে থাকেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালে শফিকুল ইসলাম অণুকে আহ্বায়ক করে প্রথম কমিটি গঠন করা হয়। আবাহনী ও ওয়ারীর ম্যাচ ড্র অবস্থায় পণ্ড হয়ে গেল বাফুফে আবাহনীর দু’পয়েন্ট কেটে নেয়। প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন আবাহনীর সমর্থকরা। পরে লীগ কমিটি ওই ম্যাচটিকে ড্র ঘোষণা করায় আবাহনী এক পয়েন্ট পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৮৪ সালে আবাহনী ও রহমতগঞ্জের ম্যাচ গোলযোগের কারণে পণ্ড হয়। তারই জেরে ডামফা আবাহনীর চার পয়েন্ট কেটে নেয়। প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করে আবাহনী সমর্থকগোষ্ঠী। তাদের আন্দোলনের মুখে ডামফা ভেঙে দেয়া হয়। এখন ফুটবলের জনপ্রিয়তা তলানিতে থাকায় আবাহনী ও মোহামেডানের সমর্থকরাও যেন অন্তরালে চলে গেছেন। এখনও আর বাসে, ট্রেনে এবং চায়ের কাপে সমর্থকরা তর্ক-বিতর্কের ঝড় তোলেন। তবে তা আবাহনী কিংবা মোহামেডান নিয়ে নয়, বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানইউ, চেলসির খেলাই থাকে বাংলাদেশ ফুটবল সমর্থকদের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
স্পোর্টস ডেস্ক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


