মণিপুরে সেনা কনভয়ে জঙ্গি হামলার প্রত্যাঘাত করল ভারতীয় সামরিক বাহিনী। সংবাদসংস্থা পিটিআই জানাচ্ছে, মঙ্গলবার প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমারে ঢুকে গোপন অভিযান চালিয়ে অন্তত ২০ জন জঙ্গিকে খতম করেছে ভারতীয় সেনা স্পেশাল ফোর্সের জওয়ানরা। তাঁদের এই অভিযানে সর্বস্তরে সহায়তা করেছে সেদেশের সামরিক বাহিনী। এই মঙ্গলবার রাতে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, সেনা অভিযান চলছে। অন্যদিকে, এদিনই মণিপুর ও নাগাল্যান্ডে জঙ্গি অনুপ্রবেশ রুখে দিল ভারতীয় ফৌজ। না-জঙ্গি সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন জঙ্গি খতম হয়েছে বলে খবর।
সেনা সূত্রে খবর, এদিন মায়ানমারের গোপন অভিযানে সেনাবাহিনীর এলিট ২১-প্যারা কম্যান্ডোদের নামানো হয়। তাঁদের সঙ্গ দেন অসম রাইফেলসের জওয়ানরা। ভারতীয় বায়ুসেনার এমআই-১৭ভি-৫ কপ্টারে চেপে অত্যন্ত গোপনে তাঁরা মায়ানমার সীমান্তের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার ঢুকে জঙ্গিদের দুটি ঘাঁটিতে অতর্কিত হামলা চালায়। স্পেশাল ফোর্সের সামনে কার্যত কোনও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি জঙ্গিরা। এই গোটা অপারেশনে ভারতীয় ফৌজকে প্রযুক্তিগত সাহায্য দিয়ে গিয়েছে মায়ামনমার প্রশাসন।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের দুই প্রধান জঙ্গিগোষ্ঠী এনএসসিএন (কে) এবং কেওয়াইকেএল জঙ্গিরাই সেখানে ছিল। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার রাষ্ট্রমন্ত্রী তথা প্রাক্তন সেনা অফিসার রাজ্যবর্ধন সিংহ রাঠৌর মায়ানমার অভিযানের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা মায়ানমারে ঢুকেছি। এটা কোনও কব্বাডি ম্যাচ নয় যে আপনি ইচ্ছেমতো ভিতরে ঢুকবেন আবার পিছিয়ে আসবেন। আমরা সীমান্ত পার করে মারব।’ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ২০ জন জঙ্গিকে নিকেশ করতে সমর্থ হয়েছে কম্যান্ডোরা। ভারতের তরফে কোনও জওয়ানের নিহত হওয়ার খবর নেই।
এদিন অভিযানের সম্পর্কে তথ্য দিতে গিয়ে সেনাবাহিনীর অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশনস (এডিজিএমও) মেজর জেনারেল রণবীর সিংহ জানান, গত কয়েকদিন ধরেই তাঁদের হাতে নির্দিষ্ট গোয়েন্দা-তথ্য আসছিল যে, আগামী দিনে মণিপুরের মতো হামলা আরও কয়েকটি জায়গায় করার ছক কষছিল জঙ্গিরা। তিনি জানান, গোয়েন্দা-তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলাগুলি করার পরিকল্পনা করছিল মণিপুরের হামলায় জড়িত জঙ্গিগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীরা। ফলে, আশঙ্কাকে নিষ্ক্রিয় করতে আগাম পাল্টা-হামলা চালানো ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার মণিপুরে সেনা কনভয়ে জঙ্গিরা হামলা চালালে ১৮ জওয়ান নিহত হন। ওইদিন সকালে চন্দেল জেলার মল্টুকে টহল দিচ্ছিলেন ৬ নম্বর ডোগরা রেজিমেন্টের জওয়ানরা। অতর্কিতে রাস্তার ধারের জঙ্গল থেকে জওয়ানদের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবৃষ্টি শুরু করে জঙ্গিরা। রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন জওয়ানরা। ঘটনাস্থলেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। সেনা হেডকোয়ার্টারে খবর পৌঁছতে তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় বিশাল বাহিনী। আহতদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য উড়িয়ে নিয়ে যেতে পাঠানো হয় হেলিকপ্টারও। হামলার দায় স্বীকার করে আলফা, কেওয়াইকেএল, এনএসসিএন (কে) সহ চারটি জঙ্গি সংগঠন।
হামলার ঘটনায় তদন্তে নেমে চাণ্ডেল সংলগ্ন পারালং, চারং, মলতু-সহ বেশ কিছু এলাকায় দিনভর তল্লাশি চালায় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ। জঙ্গিদের খোঁজে জঙ্গলে চিরুনি তল্লাশি করতে গিয়ে গোয়েন্দাদের সন্দেহ হয় যে, হামলাকারীরা সীমান্ত পেরিয়ে মায়ানমারের দিকে পালিয়ে থাকতে পারে। কারণ, ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে মায়ানমার সীমান্ত। সেখানেই এই জঙ্গিদের ঘাঁটি। হামলা চালিয়ে তারা সেখানেই পালিয়ে যায় বলে মত প্রকাশ করেন সেনা-কর্তারা।
সেনা সূত্রের খবর, এরপরই মায়ানমার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেন্দ্র। একইসঙ্গে, জঙ্গিদের গতিবিধির ওপর ক্রমাগত নজর রাখতে শুরু করে দুদেশ। এর মধ্যেই নির্দিষ্ট তথ্য আসতেই একেবারে স্পেশাল ফোর্সকে দিয়ে পুরদস্তু়র গোপন অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেনা সূত্রের মতে, এদিনের অভিযানে যে জঙ্গিদের খতম করেছে জওয়ানরা, তারা সম্ভবত মণিপুরের হামলায় জড়িত ছিল।
এদিকে, এদিনই ভারত-মায়ানমার সীমান্ত বরাবর মণিপুর ও নাগাল্যান্ডে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায় জঙ্গিরা। কিন্তু, নিরাপত্তা বাহিনী সজাগ থাকায় তারা ভারতে ঢুকতে ব্যর্থ হয়। সূত্রের খবর, মণিপুরের উখরুল এবং নাগাল্যান্ডের তুয়েনসাং জেলায় সেনা-জঙ্গিদের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়। তাতে পিপলস লিবারেশন আর্মি(পিএলএ), ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (ইউএনএলএফ) এবং কাংলেই ইয়াওল কানা লুপ (কেওয়াইকেএল) জঙ্গিরা মারা যায়।
কলকাতা ব্যুরো
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


