বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘যার যা ইচ্ছা করুন কিন্তু কেউ বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করবেন না। সতর্ক করছি, বিয়ের বয়স কমানোর ভুলটি করবেন না, কেননা এই ভুলের কোনো ক্ষমা কমিশন করবে না।’ ১১ জুন বৃহস্পতিবার ঢাকায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত ‘চাইল্ড ম্যারেজ সিনারিও ইন বাংলাদেশ: লিগ্যাল রিফর্ম’ শীর্ষক কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।
মিজানুর রহমান বলেন, ছেলে-মেয়ে কারও ১৮-এর আগে বিয়ে নয়—এ নীতিগত অবস্থান থেকে কোনো ধরনের বিচ্যুতি কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কমিশনকে বিপরীতমুখী অবস্থান যাতে নিতে না হয়, তা রাষ্ট্র ও সরকারকে মনে রাখতে হবে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি ভবনের আরডিইসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘কেউ না কেউ প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝাচ্ছেন। তবে আমাদের একটাই কথা, বিয়ের বয়স কমিয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেবেন না।’
মিজানুর রহমান আরও বলেন, ‘মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে ১৬ করার প্রশ্ন কেন আসে? নিশ্চয়ই কোনো মন্ত্রী, আমলার কোনো ছেলে বা মেয়ে কোনো কাণ্ড করে ফেলেছে। এখন বিয়ের বয়স ১৬ হলে আর কোনো ঝামেলা থাকবে না।’
১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনটি যুগোপযোগী করার জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি আইনের খসড়া করেছে। বর্তমানে সে খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের (ভেটিং) জন্য আছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে অভিভাবক বা আদালতের অনুমতিতে ১৬ বছর বয়সেও মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যাবে, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এ ধরনের একটি শর্ত নিয়েই চলছে বিতর্ক ও নানান আলোচনা। আজকের কর্মশালায়ও বিয়ের বয়সের বিষয়টিই প্রাধান্য পায়।
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর গণমাধ্যমবিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ‘সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা নেই। নারীর অধিকার, মর্যাদা, শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে, সে ধরনের কোনো আইন তিনি চাপিয়ে দেবেন না। আইন প্রণয়নের সময় সবার মতামতের ভিত্তিতেই করা হবে।’
কর্মশালার বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে ইকবাল সোবহান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান। এ ছাড়া বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে গণমাধ্যমগুলো যাতে যথাযথ প্রচার চালায়, সে জন্য তিনি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করারও আশ্বাস দেন।
কর্মশালায় বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের সার্বিক পরিস্থিতি এবং আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য কাজী রিয়াজুল হক।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু আইন করলেই হবে না, আইনটি যাতে কার্যকর হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানমও বিয়ের বয়স কমানোর কথা কেন বলা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বারবার বলছেন, বিয়ের বয়স ১৮ থাকবে। এ মন্ত্রণালয়ের সচিবও একই কথা বলছেন। আমরা দুই পায়ে দাঁড়িয়ে আছি সহযোগিতা করার জন্য। তারপরও সমস্যাটা কোথায়?’
আয়শা খানম বলেন, আইনের মাধ্যমে মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানো হলে তা হবে আত্মঘাতী এবং আইন করে শিশু ধর্ষণকে বৈধ করা।
কর্মশালায় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা জাতিসংঘ শিশু তহবিল—ইউনিসেফ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল—ইউএনএফপিএ, সেভ দ্য চিলড্রেন, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, বেসরকারি সংস্থা অপরাজেয় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। তাঁরাও কোনো ধরনের শর্তের বিনিময়ে বা ব্যতিক্রম ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিয়ের বয়স কমানোর চিন্তাভাবনার তীব্র প্রতিবাদ জানান।
কর্মশালায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী শারমীন সুলতানা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড ফোরামের সহায়তায় দুই মাস আগে নিজের বিয়ে ঠেকানোর গল্প শোনায়। চাইল্ড ফোরামের সায়মা আক্তার এবং নিজাম হোসেন শোনায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় বাল্যবিবাহ ঠেকানোর গল্প।
কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য মাহফুজা খানম। কমিশনের আরেক সদস্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


