বছরের পর বছর ধরে বিশ্বসেরা অল রাউন্ডার সাকিব আল হাসান ভারতের আইপিএল খেলে চলেছেন। সেখানে যাতায়াতের কারণে বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও নেহায়েত মন্দ নয়। ব্যক্তিগত জীবনাচরণে হিন্দি ভাষা বুঝতে ও বলতে পারলেও তিনি হিন্দিতে ইন্টারভিউ দিতে রাজি নন। ১২ জুন ফতুল্লায় এই ধরনের একটি পরিস্থিতিতে ভারতীয় হিন্দিভাষী এক টিভি চ্যানেলের সাংবাদিককে চরমভাবে অপমান করলেন তিনি।
ফতুল্লায় বাংলাদেশ-ভারত টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে সংবাদ সম্মেলন চলছিল। সংবাদ সম্মেলনটি জমিয়ে তুলেছিলেন সাকিব আল হাসান। সেখানে তিনি জুবায়ের লিখনকে নিয়ে বেশ মজার কথা বলছিলেন। কিন্তু, একটু সবাই বেশ অবাক হয়েই শুনল যখন সংবাদ সম্মেলনের একেবারে শেষ দিকে এক ভারতীয় সাংবাদিক সাকিবকে হিন্দিতে প্রশ্ন করলেন! ভদ্রলোক তার প্রশ্নে বললেন, ‘আপনি তো হিন্দি বোঝেন, হিন্দিতে যদি একটু এই টেস্টের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলতেন।’
সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্নের পর পিনপতন নিরবতা নেমে এল। সবাই নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। বছরের পর বছর আইপিএল খেলার সুবাদে সাকিব নিশ্চয়ই হিন্দি বোঝেন; হিন্দি বোঝা বা বলায় তো দোষের কিছু নেই। তাই বলে জাতীয় দলের সংবাদ সম্মেলনে হিন্দিতে উত্তর দেবেন সাকিব!
সাকিব একটু সময় ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে থেকে শুদ্ধ ইংরেজীতে বললেন, ‘স্যরি, আমি আপনার কথা বুঝতে পারিনি। ইংরেজীতে বলবেন প্লিজ।’
সাকিবের এই কথার পর সেখানে থাকা সবাই বেশ জোরে করেই নিঃশ্বাস ছাড়লেন।
সাকিব আল হাসানের সংবাদ সম্মেলনের চেয়ে বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা ক্রীড়া সাংবাদিকের জীবনে খুব একটা নেই। মাঝে মাঝে দু এক টুকরো রসিকতা করেন বটে। তারপরও সরল সত্যি হলো, এই লোকটার সংবাদ সম্মেলনে ‘মজার’ ব্যাপার বলে খুব একটা কিছু থাকে না; চমকপ্রদ কিছুও খুজে পাওয়া কঠিন।
ব্যক্তিগত আড্ডায় সাকিব চমৎকার, একান্ত স্বাক্ষাতকারেও চলনসই; কিন্তু সংবাদ সম্মেলন ব্যাপারটা তিনি জীবনেও উপভোগ করেন বলে মনে হয় না।
‘ইয়েস-নো-ভেরিগুড’ টাইপের সব উত্তর। ফলে নিতান্ত সাকিব-ভক্ত হয়েও সাকিবের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকার জন্য কখনো বাড়তি আগ্রহ টের পাইনি। গতকালও মনে হয়েছিলো, থাক; না যাই। শেষ পর্যন্ত অবশ্য গেলাম।
সাকিব ১২ জুন ফতুল্লায় একটু মুডে ছিলেন; এটা আগেই মানতে হবে।
সাধারণত সংবাদ সম্মেলনে নিজের সাফল্যের কারণ-টারণ নিয়ে খুব বেশী কিছু বলতে চান না। এদিন সামান্য প্রশ্নেই বলে দিলেন, ছোট বেলার কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিমের পরামর্শে বোলিং অ্যাকশন কিছুটা বদলে টেস্টে আবার সাফল্য পাচ্ছেন। গত কয়েকটা টেস্টে সেভাবে উইকেট পাচ্ছিলেন না বলে একটু দুশ্চিন্তায় ছিলেন।
আগের রাতেই কোচের সঙ্গে আলোচনা করেছেন; গতকালই মাঠে একটু পরিবর্তিত অ্যাকশনে বল করে সুফল পেলেন। নিজেই বলছিলেন, ‘এই অ্যাকশনটা সেভাবে এখনও ড্রিল করিনি। ভালো করে করলে আরও ভালো ফল আসবে মনে হয়!’
সাকিব এটুকু ভালো করলেই ‘বিশ্ববিখ্যাত ব্যাটসম্যান’দের নাভিশ্বাস উঠে যায়! আরও ভালো করলে তো খবর আছে।
অবশ্য সাকিব এই ‘খবর আছে’র ভঙ্গিতেই ঘোষণ করলেন, দুনিয়ার তাবৎ ব্যাটসম্যানের নাকি ভবিষ্যতে বিপদ আছে তাদের ছোট ভাই জুবায়ের হোসেন লিখনকে খেলতে গিয়ে। সাকিবের ভাষায়, ‘আমার মনে হয় জুবায়ের এমন একজন স্পিনার যার ৩০০-৪০০ উইকেট নেওয়ার মত ক্ষমতা আছে। আমরা এই দেশেই বেশি ম্যাচ খেলব, জিতবো; আর জিততে হলে উইকেট নিতে হবে। আর বাংলাদেশে উইকেট নিতে হলে আমিতো লিখনের চেয়ে ভাল বোলার আর দেখি না।’
জুবায়েরকে নিয়ে হঠাৎ সাকিব আল হাসানের এই বিজ্ঞাপন করার দরকারটা কেন পড়লো?
জুবায়ের যে ভালো স্পিনার; এই সদ্য কৈশোর পার হতে না হতেই বিরল প্রজাতির লেগস্পিনার জুবায়ের যে ক্ল্যাসিক টার্ন, গুগলিটা বেশ রপ্ত করে ফেলেছে; তা তো আমরা জানিই। এমনকি জুবায়ের গতকালও তার ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং করেননি। তারপরও কেন জুবায়েরকে নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে?
কারণ, ভেতরে ভেতরে জুবায়ের হোসেন লিখন নামে সম্ভাব্য এই দারুন প্রতিভাধর কিশোরটি স্বীকার হচ্ছেন এক অশুভ প্রতিযোগিতার ও অবিচারের।
লিখনের টেস্ট অভিষেক হয়েছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। অভিষেকটা একটু বিস্ময়কর ছিলো। যারা বয়সভিত্তিক ক্রিকেট-ট্রিকেটের খুব খবর রাখেন; তারা লিখন সম্পর্কে জানতেন; কিন্তু এতো দ্রুত আর্ন্তজাতিক ক্রিকেটে লিখন চলে আসবেন, এটা কল্পনাতে ছিলো না। কিন্তু চলে যখন এলেনই; মোটামুটি পুরো ক্রিকেটাঙ্গন বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করলো, লিখন আসলেই বিরল এক প্রতিভা।
ফলে লিখনকে যথেষ্ট যত্ন নিয়ে লালনপালন করাটা একটা বড় প্রয়োজন হয়ে উঠলো। এই অধমও তখন ‘সাদা হাতির যত্ন’ নামে এক গদ্য ফেঁদে বসেছিলো।
কিন্তু যা হয়!
সেই টেস্ট খেলার পর থেকে এই ফতুল্লা টেস্টের আগ পর্যন্ত প্রায় বসেই ছিলেন জুবায়ের! যেখানে এই ক্ল্যাসিক লেগস্পিনার ওয়ানডে কম পেতে পারেন বলে তাতে সুযোগ পেলেই বড় দৈর্ঘের ম্যাচে মাঠে রাখার তাগিদ; সেখানে এই ছেলেটি খেলাই পাচ্ছে না!
গত প্রায় আট মাস সময়ে ঢাকা বিভাগের হয়ে জাতীয় লিগে কয়েকটি ম্যাচ, প্রিমিয়ার লিগে একটি মাত্র ম্যাচ এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে পেরেছেন দেশের সেরা এই লেগস্পিনার। বিশেষ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ নামে সর্বশেষ বড় দৈর্ঘের যে টূর্নামেন্ট হয়েছে, তাতে জায়গা হয়নি লিখনের।
আর এই জায়গাটাতেই ঘোরতর আপত্তি সাকিবের।
সাকিব ভবিষ্যতবানীর মতো করে যেমন বললেন, লিখন ৩-৪ শ উইকেট নেবে; তেমনই সতর্কতার কথা জানিয়ে দিলেন, এমন অযত্ন-অবহেলা করলে পড়ে পাওয়া এই সম্পদ হারাতেও সময় লাগবে না।
আমরা জানি না, জুবায়ের হোসেনকে নিয়ে সমস্যাটা কী; জানতেও চাই না। জুবায়েরকে নিয়ে টানাটানি, রেষারিষি; অনেক কিছু শোনা যায়। এর পছন্দ, ওর অপছন্দ; অনেক গুঞ্জন শুনি। শুনতে পাই যে, একজন কোচের অপছন্দের কারণেই ঘরোয়া কোনো দলে খেলা হয় না এক লিখনের।
আমরা এসব আর শুনতে চাই না। অন্তত সাকিব আল হাসান এই কথাগুলো বলে ফেলার পর আশা করবো আমরা, এখানেই শেষ হবে লিখনকে নিয়ে ঠেলাঠেলির এই অধ্যায়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে বেরিয়েই লিখেছিলাম, ‘এটা খুব দরকার ছিলো। দেশের ক্রিকেটের মুখ চেয়ে কাউকে না কাউকে কথাগুলো বলতে হতো। ছেলেটার প্রতি চলতে থাকা অবিচারের প্রতিবাদ কাউকে না কাউকে কতে হতো।’
এবার বলি, দেশের ক্রিকেটের মুখ চেয়ে অন্তত আপনারা যারা নীতি নির্ধারক আছেন, তারা ছেলেটার যত্ন নিন।
ও হ্যা, সাকিব আমাদের দর্শকদের জন্যও একটা বার্তা দিয়েছেন, ‘লেগস্পিনারকে দলে রাখতে গেলে যে সাফল্য পেতে একটু ধৈর্য্য ধরতে হয়, সেটা আমরা দলের সবাই জানি। আমরা ধৈর্য্য ধরতে প্রস্তুত; কিন্তু আপনারা-দর্শকরা ধৈর্য্য ধরবেন কি না, তা তো জানি না।’
এই প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু কোনো বোর্ড কর্মকর্তা বা কোচের হাতে নয়; আমার-আপনার হাতে। আপনি-আমি রেডি তো?
র্স্পোটস ডেস্ক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


