বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণ: মীমাংসার নামে পুলিশের ধান্দা

Police1433168583স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে স্ত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। সেই গণধর্ষণের সেই ধর্ষণের নামে মামলা না নিয়ে মীমাংসার গুরুদায়িত্ব নেয় পুলিশ! এই বিচারের নামে ধর্ষকদের থেকে টাকা নিয়ে ধর্ষিতাকে থানায় বসিয়ে রেখে পুলিশ টাকাপয়সা লেনদেন করে বিচারের নামে নিজেদের ধান্দা শুরু করে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চুক্তিতে কর্মচারীর কাজ করতেন মোমিন হোসেন। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বেড়ানোর সময় পেতেন না। ঢাকায় তার অনেক আত্মীয়স্বজন থাকেন। প্রায়ই তারা বেড়াতে আসতে বলতেন। স্ত্রীর খালা হালিমা বেগমও তাদের দুইজনকে বেড়াতে আসার তাগাদা দিতেন। অফিস থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়ে স্ত্রীসহ বুধবার বিকালে পশ্চিম রামপুরার ১৯২, নম্বর খালার বাড়িতে বেড়াতে আসেন।

গত শুক্রবার ১২ জুন বাসার তৃতীয় তলায় স্বামী-স্ত্রী মিলে টেলিভিশন দেখছিলেন। এ সময় কয়েক যুবক দরজার কড়া নাড়ে। কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে খালা হালিমা বেগম দরজা খুলে দেন। এরপরের ঘটনা কান্না, চিৎকার আর নির্যাতনের করুণ কাহিনী।

অনেক কাকুতি ও মিনতির পরও তারা ওই দুর্বৃত্তদের মন গলাতে পারেননি। মোমিনকে পাশে নিয়ে গিয়ে বেঁধে রেখে দলবেঁধে পালাক্রমে ধর্ষণ করে তরুণী স্ত্রীকে। মোমিনের স্ত্রী নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর মোমিন ও তার নির্যাতিত স্ত্রী, তাদের খালা হালিমা ও এলাকার দুই যুবকসহ তারা রামপুরা থানায় যান। পুলিশের কাছে দাবি জানান, দুর্বৃত্তদের শাস্তি ও গ্রেপ্তার করার জন্য। কিন্তু, মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে পুলিশ। এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত থানায় বসিয়ে রেখে ১০ হাজার টাকায় সমঝোতার চেষ্টা করে পুলিশ। এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে উল্টো ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়।

নিরুপায় হয়ে তারা আবার বাসায় ফিরে যান। কিন্তু গণধর্ষণে নির্যাতিত গৃহবধূর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় শনিবার ১৩ জুন দুপুরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়। ওই গৃহবধূ সেখানেই চিকিৎসাধীন আছেন।

হাসপাতালে ভর্তি হলে ঘটনাটি শনিবার জানাজানি হয়। এরপর রাতে নির্যাতিত ওই গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে থানায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৫ জনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেছেন। তবে রবিবার পর্যন্ত ওই ঘটনায় জড়িতদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

রবিবার সকালে ঢাকা মেডিক্যালে বীভৎসতার বর্ণনা দিয়ে ওই গৃহবধূর স্বামী মোমিন হোসেন জানান, প্রায় ১ বছর পর তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে খালার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। সোমবার আবার তাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। শনিবার সকালে দারুস সালাম এলাকায় তার আরেক আত্মীয়র বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল।

রামপুরার ওই বাড়ির তিনতলার বামপাশের একটি বেডরুমে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ফ্ল্যাটের মূল দরজা বন্ধ ছিল। বিকাল পৌনে ৪টায় দরজার কড়া নাড়ার শব্দ শোনা যায়। খালা হালিমা দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ৪ যুবক হুড়োহুড়ি করে ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় তারা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে। তাদের চিৎকার শুনে তারা স্বামী-স্ত্রী রুম থেকে বের হয়ে আসেন।

মোমিন জানান, ওই যুবকের মধ্যে একজন তার কাছে জানতে চায় যে, তার সঙ্গে নারী তার প্রকৃত স্ত্রী কিনা? নাকি তারা গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় পালিয়ে এসেছেন? একথা শুনে অবাক হয়ে যান মোমিন। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেন।

তিনি তাদেরকে হেসে বলেন, গত ২ বছর আগে তাদের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছে। তারা তাদের খালার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। একথা বলার পরও ওই যুবকেরা মোমিনের কথা বিশ্বাস করতে চায়নি। ওই যুবকেরা মোমিনকে আবার একই প্রশ্ন করে। বিভিন্ন জেরা শুরু করে। মোমিন তাদেরকে জানান, বিশ্বাস না করতে চাইলে তারা গ্রামের বাড়িতে ফোন দিতে পারে।

মোমিন জানান, একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে মোমিন তাদেরকে প্রশ্ন করে বলেন, আপনারা কারা? কেন এখানে এসেছেন? একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ওই যুবকেরা তাকে ওই বাড়ির চতুর্থ তলার ছাদে নিয়ে যায়। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। তারা তাকে বলে যে, ‘তোকে নিচে নিয়ে যাবো। তুই বলবি যে, ওই নারী তোর স্ত্রী না। যদি না বলিস তাহলে তোকে জানে মেরে ফেলবো।’

প্রায় ১ ঘণ্টা নির্যাতনের পর তারা তাকে আবার তৃতীয় তলায় খালার ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। নির্যাতিত ওই তরুণীর খালা হালিমা বেগম জানান, বাড়িতে লোকজনের চিৎকার শুনে ওই বাড়ির অন্য ফ্ল্যাটের লোকজন বিষয়টি জানতে চান। এ সময় ওই যুবকেরা তাদের হুমকি দিয়ে বলে যে, কোনওরকম শব্দ করলে মেরে ফেলা হবে। যার যার ফ্ল্যাটে সবাইকে তারা চলে যেতে বলে।

এরপর তারা মোমিনকে বলে যে, ‘তুই বল সে তোর স্ত্রী না’। কিন্তু, মোমিন চিৎকার দিয়ে বলে যে, সে তার বিবাহিত স্ত্রী। এটাই সত্য। একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা মোমিনের হাত ও পা আবার বেঁধে ফেলে।

হালিমা বেগম আরও জানান, তারা আবার তাকে চতুর্থ তলার ছাদে নিয়ে যায়। তাকে বাড়ির ছাদের এক কোনে ফেলে রাখে। আমাকে ফ্ল্যাটের বাথরুমে আটকে রাখে। এরপর ওই চার যুবক একে একে ফ্ল্যাটের বামপাশের একটি বেডরুমে ওই গৃহবধূকে একের পর এক ধর্ষণ করে যায়।

এরপর রাত ৮টার পর সেখান থেকে চলে যায়। যাওয়ার সময় ওই দুর্বৃত্তরা ৫ হাজার টাকা ও তিনটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। পরে নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ ঘর থেকে বের হয়ে বাথরুমে আটকে থাকা তার খালাকে উদ্ধার করেন। পরে তার খালা বাড়ির ছাদ থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মোমিনকে উদ্ধার করেন।

হালিমা বেগম আরও জানান, তিনি ৪ যুবককে চিনতে পেরেছেন। ওই দুর্বৃত্তরা হলো: আরিফ, রাহাত, মঈন ও রুবেল। তারা এলাকার উঠতি মাস্তান হিসাবে পরিচিত। তাদের ভয়ে সবাই তটস্থ থাকে।

নির্যাতিতার স্বামী মোমিন হোসেন বলেন, এই নিষ্ঠুরতার বিচারের জন্য তারা রাতের বেলায় রামপুরা থানায় যান। থানায় কর্তব্যরত পুলিশের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানালে সব ঘটনা শুনে থানার পুলিশের কর্মকর্তারা জানান যে, ‘যা হবার হয়ে গেছে। আপনারা এখন বাড়ি চলে যান। গরিব মানুষ মামলা করলে টাকা পয়সা খরচ হবে। ঢাকা শহরের ব্যাপার। কিছু টাকা নেন। নিয়ে চলে যান। এটাই ভাল হবে।

পুলিশের এই বক্তব্যে আশ্চর্য হয়ে যান তারা। মোমিন এ সময় থানায় চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন যে, এই পাশবিকতার বিচার চাই। তাতে যা হবার তাই হবে। এ সময় তাকে থানার এক পুলিশের এসআই হুমকি দিয়ে বলে যে, ১০ হাজার টাকা নিয়ে কেটে পড়। এরপর একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই তারা থানা ছাড়েন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির সমন্বয়ক ডা. বিলকিস বেগম জানান, ওই গৃহবধূ মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছেন। তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় তার ফরেনসিক পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও জানান, তাকে আপাতত বিশ্রামে রাখা হয়েছে। মানসিক শক্তিকে দৃঢ় করার জন্য কাউন্সেলিং করা হচ্ছে।

রামপুরা থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন জানান, ওই গৃহবধূর মামলা থানায় নেয়া হয়েছে। আসামিদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা গেছে। তাদের ধরতে অভিযান চলছে। ভিকটিমের পরিবারের মামলা না নেয়া ও হমকির বিষয়টির ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এমন তথ্য তার জানা নেই।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন