বাংলাদেশে রোজার সময় টেলিভিশন চ্যানেল ও পত্রিকাগুলোতে ইফতারির সংবাদের একটি প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরান ঢাকার চকবাজারের ইফতার বিক্রি নিয়ে। বিক্রেতাদের মিথ্যা তথ্য ও ঐতিহ্যের নামে মানুষকে প্রতারণা ছাড়া এই ইফতার আর কিছুই হতে পারে না। দু’তিনটি দোকান ছাড়া বেশিরভাগই তৈরি হয় নোংরা পরিবেশে, বাসি ও অপরিচ্ছন্নভাবে সংরক্ষণ করা খাবার বিক্রি করাও এখন সেখানে একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ওই যে মিডিয়া ক্যু- যার শিকার হয়ে মানুষ দলে দলে যান চক বাজারে; কিন্তু এটা নিশ্চিত চকের ইফতারের সবচেয়ে প্রধান প্রতারণা ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ যে একবার খেয়েছে, সে আর কোনোদিন তা খেতে চাইবেন না- এটা নিশ্চিত। দই বড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা, এটিও সবচেয়ে ভুয়া একটি জিনিস।
‘বড় বাপের পোলায় খায়’ যদি কেউ খেতে চান, খেয়ে দেখেন, একবার খেলে আর দ্বিতীয়বার খাবেন না। এই খাবারের কথা ইতিহাসে কোথাও পাবেন না। হাকিম হাবিবুর রহমান বা এরকম কোন ইতিহাসবেত্তার লিখনিতো বাদ দিলাম, পুরাতন ঢাকার অরিজিনাল আদি বাসিন্দা যারা চকবাজারের ইফতার সম্পর্কে খোঁজ রাখেন, তারা কেউ এই খাবারের কথা বলবে না আপনাকে। এই খাবারের ইতিহাস হল, একজন মুড়ি ভর্তা বিক্রেতার উর্বর মস্তিস্কের ফসল এই ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ খাবারটি (পুরাতন ঢাকায় মুড়ি মাখানোকে মুড়ি ভর্তা বলে)। এর নাম আগে ছিল চেকসোয়া ভর্তা। হঠাৎ করে কবে থেকে যেন হয়ে গেল বড় বাপের পোলায় খায়!
চক বাজার গেলে কাবাব কিনবেন, নামেই সেগুলো কাবাব। রেশমি কাবাব, সুতি কাবাব, জালী কাবাবা, বটি কাবাব ইত্যাদি নামের কাবাবগুলো আসলে কোনও কাবাবের কোয়ালিটিতে পরে না। একান্তই যদি কিনতে চান, তবে আনন্দ বেকারি যা চকবাজার মসজিদের নীচে অবস্থিত সেখানে ঢুকে পড়েন।
চকবাজারে জিলাপি কিনবেন বোম্বে কনফেকশনারি থেকে, আর না হয় চকবাজার শাহী মসজিদের পেছনে ‘চুড়িহাট্টা’ নামের যে গলি আছে সেখানকার ‘নিয়াজের জিলাপি’ থেকে। ভুলেও রাস্তার উপরের ‘দই বড়া’ কিনবেন না, না হলে বাসায় গিয়ে নিজেকে গালি দিবেন, আর গালি দিবেন পুরাতন ঢাকার খাবার দাবার’কে।
দোষ কি আসলে পুরাতন ঢাকার খাবারের? আপনি নান্না আর হাজীর বিরিয়ানি নাম শুনলেই ঢুকে পড়ছেন লোভনীয় কোন খাবারের আশায়। নান্না বিরিয়ানি নামে এখন যে বিরিয়ানি বিক্রি হয় তার যাত্রা ২০০০ সালের দিকে লালবাগ চৌরাস্তায়, অরিজিনাল নান্না মিয়া’র আত্মীয়র দ্বারা। তখনো বেচারাম দেউড়ীর অরিজিনাল নান্না’র মোরগ পোলাও টিকে ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নান্না মিয়ার ছেলেদের কোন্দল এবং আর্থিক ঋণের কারণে তাদের ব্যাবসা গুটিয়ে নেয় এবং এই নতুন নান্না তা কিনে নেয়। যদিও এই নতুন নান্না মিয়ার বিরিয়ানি’র মানও খুব ভালো। কিন্তু তা সব শাখায় পাওয়া যায় না।
আচ্ছা আপনি কি ‘পালোয়ানের পোলাও’ এর নাম শুনেছেন? অথবা চকবাজারের ‘শাহ্ সাহেব এর খাসির বিরিয়ানি’র নাম? আপনি অধুনা প্রতিষ্ঠিত রয়েল, আফতাব, মামুন, শমসের এদের খাবার খেয়ে পুরাতন ঢাকার সেই ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ খুঁজতে যাবেন না যেন। পুরাতন ঢাকায় দোকান দিলেই তা পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার হয়ে যায় না। এই সব কয়টি দোকান আমার চোখের সামনে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েল সবচেয়ে নাম করেছে, বিশেষ করে রয়েলের বাদামের শরবত। কিন্তু ১৯৯৮ এর দিকে যখন এরা যাত্রা শুরু করে সে সময়কার বাদামের শরবতের কাছে এখনকারটা নস্যি।
পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইফতার নামে যে সব অখাদ্য এবং কুখাদ্য এখন চকবাজারে বিক্রি হচ্ছে তা নিয়ে হাইলাইট করে ইতিহাসকে নষ্ট করবেন না। পুরাতন ঢাকার খাবার সম্পর্কে জানতে হাকিম হাবিবুর রহমান সহ অনেক ইতিহাসবেত্তার বই পড়ে দেখেন, কিন জৌলুশ আর জাঁকজমকপূর্ণ ছিল সেই খাবারের আয়োজনগুলো। ঢাকার রমজান ও ঈদের বড় আকর্ষণ ছিল খাবার। রোজায় ঘরে অনেক রকম ইফতারি থাকলেও সবাই একবার চকে ছুটে যেতেন। চক সেই মুঘল আমল থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য, খাবার-দাবার আড্ডার কেন্দ্র। চকের ইফতারির কিছু বিবরণ রেখে গেছেন আবু যোহা নূর আহমেদ। খাবারগুলো ছিল_শিরমলি, বাকেরখানি চাপাতি, নান রুটি, কাকচা, কুলিচা, নানখাতাই, শিক কাবাব, হান্ডি কাবাব, মাছ ও মাংসের কোফতা, শামী ও টিকা কাবাব, পরাটা, বোগদাদী রুটি, শবরাতি রুটি, মোরগ কাবাব, ফালুদার শরবত ও নানারকম ফল।
(এই লেখায় বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে)
নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


