ক্রিকেটে বিজয়ের এই গৌরবময় দিনে দেশের তো বটেই ভারতসহ পৃথিবীর আরও অনেক দেশের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সাফল্য কাহিনী পড়ছিলাম। গতকাল থেকে বাংলাদেশের সব মানুষের মত আমিও ফুরফুরে মেজাজে আছি। বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ভালো সংবাদ তো বিরল ঘটনা। সেই বিরল ঘটনাতেই আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। এমন সময় বার্মিজ ভাষার মিয়ানমার এক্সপ্রেসে প্রকাশিত একটি সংবাদে মন খুব বেশি রকমের খারাপ হয়ে গেল।
বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)’র পোষাক তার শরীরের উপরে অংশে। নিচের অংশে লুঙ্গি। বুকের বাম দিকে নেম কার্ড, ডান দিকে ব্যাজ। একটি ছবিতে সামনে এমএম২ (সম্ভবত) রাইফেল, গুলি, তিনটি মোবাইল ফোন, আরও কিছু জিনিসপত্র পেছনে দাঁড়ানো বিজিবি সদস্য। আরেকটি ছবিতে তিনি একটি চেয়ারে বসে আছেন হাত কড়া পড়ানো অবস্থায়। চেহারা উদভ্রান্ত। আমাদের দেশে পুলিশ যেমন চোর বা সন্ত্রাসী ধরে উত্তম মাধ্যম দিয়ে হাত-বেঁধে যেভাবে ছবি তোলে, ঠিক সেভাবে এই বিজিবি সদস্যের ছবি তোলা হয়েছে।
এই বিজিবি সদস্যের নাম নায়েক রাজ্জাক। যাকে গত ১৭ জুন ভোরবেলা নাফ নদী থেকে ধরে নিয়ে যায় মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী।
বিজিবি নাফ নদীতে টহল দেয়ার সময় আক্রান্ত হয় মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী দ্বারা। বিজিবির একজন গুলিবিদ্ধ হয়, আর নায়েক রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যায়।
কিন্তু স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নাফ নদীতে ভুল বোঝাবুঝিতে গুলি হয়েছে। বিজিবির একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে, আর একজন মাছ ধরার জালে আটকে মিয়ানমারের অংশে রয়ে গেছে। তিনি অপহৃত হয়েছেন বা মিয়ানমার বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে গেছি, বিষয়টি তেমন নয়। পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনা হবে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এটাকে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে বর্ণনা করলেন। গতকাল ঢাকাস্থ মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডাকা হলো। তিন দিনেও পতাকা বৈঠক হলো না। বলা হলো নায়েক রাজ্জাক ভালো আছেন। আজ মিয়ানমারের পত্রিকায় চোর -সন্ত্রাসীর মর্যাদা দিয়ে বিজিবি সদস্য নায়েক রাজ্জাকের ছবিসহ সংবাদ প্রকাশিত হলো।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে যা ’সামান্য ভুল বোঝাবুঝি’ বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার কাছে তা চরম লজ্জার। আমার ধারণা যারা এই সংবাদটি জানছেন, তাদের কাছেও বিষয়টি অত্যন্ত লজ্জাজনক।
মহাপরিচালক দেশের ভেতরে মানুষকে হুমকি দেন, বিজিবির হাতে অস্ত্র আছে। সেই অস্ত্র দিয়ে গুলি করা হবে। কিন্তু মিয়ানমার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার সময় এই অস্ত্র কোথায় থাকে? নায়েক রাজ্জাককে যখন ধরে নিয়ে গেল তখন এই অস্ত্র কোথায় ছিল? ভারতীয় বিএসএফ যখন বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে গুলি করে কৃষক হত্যা করে, তখন অস্ত্র কোথায় থাকে?
ভারত বা মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধের কথা বলছি না। কিন্তু মানুষকে রক্ষার, আত্মরক্ষার ক্ষমতা-সামর্থ তো একটি স্বাধীন দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর থাকতে হবে। সেটা যখন থাকে না, তখনই হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যখন ব্যর্থতা আড়াল করতে, অসত্য তথ্য দিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেন, তখন মানুষের ভেতরে ক্ষুব্ধতা জন্ম নেয়।
আজ মিয়ানমারের পত্রিকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনী বিজিবি নিয়ে যে সংবাদ প্রকাশিত হলো, যে ছবি ছাপা হলো তা আমাদের জন্যে জাতীয় লজ্জা।
এই তিনটি ছবিসহ চোর -সন্ত্রাসীর মত করে বিজিবি সদস্য নায়েক রাজ্জাকের সংবাদটি ছাপা হয়েছে। মিয়ানমার ভাষায় লেখা হয়েছে, এই বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড সদস্য মিয়ানমারের ভেতরে ঢুকে পড়লে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে।
(সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজার ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেওয়া)
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।
সীমান্তে গোলাগুলি নিয়ে আরো পড়ুন: ধরে নিয়ে যাওয়া সীমান্তরক্ষীকে ফেরাতে মিয়ানমারের গড়িমসি


