বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কাজের বুয়া হলেন হাসপাতালের মালিক

Subhashini-Devi_Hospital৭২ বছর বয়স। কৈশোরের পর থেকেই যিনি মানুষের বাড়িতে ‘বুয়া’র কাজ করছেন। অন্যের বাড়িতে ঝি’য়ের কাজ করলেও মানসিকতাতে তিনি মানবতাবাদী। আর সেই উদাহরণও তিনি রাখলেন, মহৎ একটি কাজ করে। মানুষের সেবার জন্য সারাজীবন তিনি মুখিয়ে ছিলেন। সুযোগ খুঁজছিলেন কিভাবে বেশি মানুষের সেবা করা যায়। মনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে থাকা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন তিনি। দিয়েছেন একটি হাসপাতাল। আর দশজনের মতো বাণিজ্য করা তার উদ্দেশ্য নয়। একেবারে নির্ভজাল সেবার জন্যই তার হাসপাতাল। নামও ‘হিউম্যানিটি হসপিটাল’। কলকাতার উপকণ্ঠে হাঁসপুকুরে তার এই হাসপাতাল। নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমের পাঠকদের জন্য এই মহিয়সী নারীর গল্প তুলে ধরা হলো।

তাঁর মুখের দিকে চাইলে, দুটো কথা বললে, মনটা হালকা হয়ে যায়, নিজের মায়ের মুখটা ভেসে আসে! একজন ৭২ বছরের বৃদ্ধা, সুভাষিণী মিস্ত্রি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এই মহিলা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে নির্মাণ করেছেন একটি হাসপাতাল।

আমরা সেই মায়ের গল্প শুনব। এমন একজন মা, যিনি মানবকল্যাণের স্বার্থে বাজি রেখেছেন গোটা জীবন। লোকের বাড়ি বাসন মেজেছেন, সবজি বিক্রি করেছেন, দিন মজুরি করেছেন, লোকের জুতো পালিশ করেছেন দিনের পর দিন। মাথা নত করেছেন সারাজীবন মাথা উঁচু করে বাঁচবেন বলে। যেটুকু উপার্জন করেছেন, সিংহভাগটাই চলে গেছে হাসপাতাল তৈরির কাজে। এমন একটি হাসপাতাল, যেখানে রোগীকে সামান্য অসুখের জন্যে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করতে হয় না। কোনও কারণ ছাড়া এটা পরীক্ষা, সেটা পরীক্ষা করতে হয় না। যেখানে চিকিৎসা হয় আগে। ফর্মের সই করে, টাকা জমা দিয়ে তবেই হবে চিকিৎসা- এমনটা এখানে চলে না। ন্যূনতম খরচে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। সবই একজন মায়ের পরিশ্রমের ফল। সেই মা আর কেউ নন, পশ্চিমবঙ্গের সুভাষিণী মিস্ত্রি।

১২ বছরে বিয়ে হয়ে যায়। কোলে ৪ সন্তান। তায় সদ্য বিধবা হয়েছেন। শুরু হয় সুভাষিণী দেবীর আমরণ সংগ্রাম। বয়স তখন কত আর হবে, মাত্র ২৩। বিনা চিকিৎসায় স্বামী গত হয়েছেন। সেই শোক সামলাবেন, নাকি ৪ সন্তানকে মানুষ করবেন! এদিকে তিনি লেখাপড়াও শেখেননি। ছোটোখাট চাকরি জুগিয়ে সংসার চালানোর পথও বন্ধ। শুনে হয়তো মনে হবে, এ আর নতুন কী! বাংলার কত মা-ই তো কম বয়সে বিধবা হয়ে সংসারের ঘানি টেনেছেন, সন্তান মানুষ করেছেন। সুভাষিণী দেবী আলাদা কোথায়?

আলাদা, তিনি নিঃসন্দেহে একজন ব্যতিক্রমী মা। তিনিই পেরেছেন কিছু করে দেখাতে। চারপাশের পৃথিবীটাকে পালটে দিতে।

স্বামী গত হওয়ার পর একেবারে অথই জলে পড়ে যান ৪ সন্তানকে নিয়ে। স্বামীর মৃত্যুশোক বড় শোক। এদিকে স্বামীরও যে রোজগারপাতি খুব বেশি ছিল, তা নয়। টেনেটুনে চলে যেত দিন। স্বামী বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন, এ শোক কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না সুভাষিণী। কাছের মানুষের অসহায় মৃত্যু তাড়া করে বেড়াত তাঁকে। কিছু একটা করতে হবে, কিছু একটা করতেই হবে… এমন স্থির করলেন। চোখের সামনে আর কোনও ব্যক্তিকে যাতে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ খোয়াতে না হয়, তার জন্য নিজেকে নিজে কথা দিলেন সুভাষিণী দেবী। মনে মনে পণ করলেন হাসপাতাল গড়বেন। সেই হাসপাতালে গরিবের চিকিৎসা হবে বিনে পয়সায়।

কিন্তু হাসপাতাল গড়া তো মুখের কথা নয়। অনেক টাকা লাগে। ডাক্তার, নার্স, ওষুধপত্র, চিকিৎসার যন্ত্র – বিস্তর খরচ। কে দেবে অত টাকা? কোনও গৌরি সেন থাকলে কাজটা সহজ হতে পারত!‍ কিন্তু সেরকম কোনও উপায় ছিল না সুভাষিণী দেবীর কাছে। স্বপ্নকে উড়ান দিতে জীবনের সমস্ত পুঁজি ঢেলে দিয়েছেন তিনি। লোকের বাড়ি আয়ার কাজ করেছেন। জুতো পালিশ করে উপার্জন করেছেন সামান্য কয়েকটা টাকা। দিন মজুর হয়ে কাজ করেছেন। প্রতিদিন ১ টাকা ২৫ পয়সা রোজগার ছিল তখন। পুরো টাকাটাই জমিয়ে রেখেছিলেন। মধ্য কলকাতার পার্ক সার্কাসের বাজারে সবজি বিক্রি করেছেন। তবুও হেরে যাননি। পরিস্থিতির কাছে মাথা নত করেননি একবারও।

সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করেছেন। ৪ সন্তানের মধ্যে একটি ছিল রত্ন। অসম্ভব মেধাবী, ছেলে অজয়। তাকে ডাক্তার বানানোর খুব শখ ছিল সুভাষিণীর। ছেলে ডাক্তার হবে, গরিবদের হাসপাতালে তাঁদের চিকিৎসা করবে, এমন ইচ্ছে পোষণ করতেন মনে মনে। কিন্তু গরিব মায়ের অভাবের সংসারে থেকে ডাক্তার হওয়া যে কঠিন বিষয়, আগে থেকেই আঁচ করেছিলেন সুভাষিণী দেবী। ছেলেকে তাই রেখে এসেছিলেন অনাথ আশ্রমে। অনেকে বলবেন, মা হয়ে সন্তানকে অনাথ আশ্রমে রেখে আসা খুব দায়িত্বহীন কাজ, স্বার্থপরের মতো শোনায়। কিন্তু সেখানে থেকেই লেখাপড়া করে ডাক্তারি পাশ করেছিলেন অজয়। লোকে কী বলে, তাতে কী এসে যায়!

সালটা ১৯৯৩। জমানো টাকায় হাসপাতাল বানানোর জন্যে কলকাতার শহরের বাইরে ১ বিঘা জমি কিনে ফেললেন সুভাষিণী দেবী। অনেক কম দামে। জায়গাটি কলকাতার কাছাকাছি একটি গ্রামে, হাঁসপুকুর। ১৯৯৬ সালে সেখানে গড়ে উঠল হাসপাতাল। নাম দেওয়া হল হিউম্যানিটি হাসপাতাল ‘Humanity Hospital’। হাসপাতাল খোলার প্রথম দিনই ২৫২ জন রোগীর চিকিৎসা হয়েছিল সেখানে। আজ যদি সেখানে যান, দেখতে পাবেন হাসপাতাল চত্তরে কত গরিব মানুষ চিকিৎসারত। বর্তমানে অজয়কে নিয়ে ডাক্তারের সংখ্যা ১২জন। ২৫টি বেড রয়েছে। হাসপাতালকে আরও বড় করার জন্য বেশ কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি এগিয়ে এসেছেন। আশপাশে আরও ২ বিঘা জমি কেনা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল হিউম্যানিটি হসপিটালের ডাক্তারদের ফি মাত্র ১০ টাকা। খুব গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার ৫,০০০ টাকার মধ্যে সম্পন্ন হয়। ছেলে অজয় এখন সেখানকার সব কিছু। তার বাকি ভাই বোনেরাও আজ হাসপাতাল নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। ছোটো বোনটি নার্স। মায়ের স্বপ্নকেই জীবনের উদ্দেশ্য করে নিয়েছে তাঁরা।

আর সুভাষিণী দেবী? নাতনির হাত ধরে “লেডি উইথ দা ল্যাম্প”-এর মতো রোগীদের আশপাশে থাকেন। তাঁদের সুস্থ হওয়া দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।

এমন মানবতাবাদী সুভাষিণী দেবীর-ই প্রয়োজন বাংলার ঘরে ঘরে।

কলকাতা ব্যুরো

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম

আরও পড়ুন