বিভিন্ন দেশের ২০১৪ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতি বছরের মতো এবারও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বেশকিছু বিষয়কে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হল- বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, অনলাইন ও মিডিয়ার ওপর বিধিনিষেধ, শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নাজুক অবস্থা ও দুর্বল শ্রম অধিকার। এছাড়া নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতন ও অন্যান্য অন্যায়, সরকারি পর্যায়ে ব্যাপক দুর্নীতি, খেয়ালখুশি মতো গ্রেফতার ও আটক, দুর্বল বিচারিক সক্ষমতা এবং স্বাধীনতা ও বিচারের আগে দীর্ঘ সময় আটক রাখাকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যদিও প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ, সংসদীয় গণতান্ত্রিক এবং গতিশীল নাগরিক সম্প্রদায়ের দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ২০১৪ সালের সংসদীয় নির্বাচন, নির্বাচন বর্জন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সমালোচনার কথা উঠে এসেছে।
প্রশ্ন হল, সরকার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ মানবাধিকার প্রতিবেদনকে কতটা আমলে নেবে বা গুরুত্ব দেবে? গণতন্ত্রের উন্নয়ন, মানবাধিকার, আইনশৃংখলা পরিস্থিতি, শিক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া উন্নয়নের ধারা কোনোমতেই বজায় রাখা সম্ভব নয়। কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে চাইলে উপরোক্ত বিষয়সমূহকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি।
বাংলাদেশে কাগজে-কলমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বহাল থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে তা সম্পূর্ণ বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সুশাসন নিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে যে সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়েছে, যা দূর করা সরকারেরই দায়িত্ব। এদেশের মানুষের উচ্চাশা ও উন্নয়ন প্রত্যাশা যাতে হতাশায় পর্যবসিত না হয়, এ ব্যাপারে সরকার মনোযোগী হবে- এটাই প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনে মেয়েদের বাল্যবিয়ে ও জোরপূর্বক বিয়ের সমস্যাসহ শিশুশ্রমকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও কোনো কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর সামাজিক সহিংসতাকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, ২০১৪ সালে দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। বছরব্যাপী ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকা রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃংখলা পরিস্থিতি অবনতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতংক ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সারা দেশে অনেকেই গুপ্তহত্যার শিকার হওয়া ছাড়াও রাজনৈতিক সংঘাত, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সন্ত্রাসীদের হামলা ও একাধিক সীমান্ত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া প্রচুর নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
তবে মানবাধিকারের প্রধান দুই ভাগের মধ্যে একটিতে অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যুর হার ও দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়াসহ ৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা, দেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের আলোকে শিশু আইন-২০১৩ প্রণয়ন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩, পিতামাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন-২০১৩ ও জাতীয় নদী রক্ষা আইন-২০১৩ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
বিশেষ সম্পাদকীয়
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


