লিচুর দেশ দিনাজপুরে এনডোসালফিন কীটনাশক মিশ্রিত লিচু খেয়েই ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর)। বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে প্রয়োজনীয় নমুনা যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিডিসি আটলান্টায় পাঠানোরও প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে আইইডিসিআর সূত্রে জানা গেছে।
কীটনাশক ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ ছিটানোয় দিনাজপুরের বিভিন্ন বাগানের লিচু বিষাক্ত হয় উঠে। এসব লিচু খেয়ে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় ১১ শিশুর। দেড় থেকে ৬ বছর বয়সী ওই শিশুরা চলতি বছরের ২৯ মে থেকে ১৮ জুনের মধ্যে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা থাকা অবস্থায় মারা যায়। বিষয়টি নিশ্চিত হতে দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ উপজেলায় গঠন করা হয় পৃথক পাঁচটি তদন্ত কমিটি। ২৫ জুন গঠিত এসব তদন্ত কমিটিকে পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
এদিকে লিচুসহ অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর। আইইডিসিআরর গবেষণার প্রাপ্ত প্রাথমিক অনুসন্ধান ফলাফলের ভিত্তিতে এনডোসালফিন গ্রুপের কীটনাশক মিশ্রিত লিচু খেয়ে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইইডিসিআরর পরিচালক অধ্যাপক ড.মাহমুদুর রহমান শনিবার জানান, রোগতত্ত্ব গবেষণার সঠিক গাইডলাইন অনুসরণ, ব্যাপকভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও পারিপার্শ্বিক বিবেচনায় তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন যে, বিষাক্ত কীটনাশকযুক্ত লিচু খাওয়ার জন্যই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেইফটি ল্যাবরেটরিতে ২৯ ধরনের কীটনাশক পরীক্ষা হয়। কিন্তু সেখানে এনডোসালফিন পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় এ ব্যাপারে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। আর এ কারণেই স্থানীয় শিশুদের সংগৃহীত রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি আটলান্টায় পাঠানো হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ন্যাশনাল ফুড সেইফটি ল্যাবরেটরির একজন কর্মকর্তা শনিবার বলেন, লিচুতে বিষাক্ত কেমিক্যাল ছিল। তবে তাদের সব ধরনের কেমিক্যাল পরীক্ষার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও রিয়েজেন্ট না থাকায় কি ধরনের কীটনাশক ছিল সেটা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান জানান, দিনাজপুরের লিচুসহ বিভিন্ন বাগানে উৎপাদনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কয়েক দফায় বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক, এন্টি ফাঙ্গাল ও গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করা হয়। আইইডিসিআরের তদন্ত দল ওই এলাকায় ১৫ দিন অবস্থান করে আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশনের যথাযথ গাইড লাইন অনুসরণ করে প্রায় নিশ্চিত হয়েছে- বিষাক্ত কীটনাশক পানেই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে।
বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এনে দিনাজপুর জেলা প্রশাসন বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কীটনাশকযুক্ত লিচু খেয়ে শিশু মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে জেলার পাঁচটি থানায় একটি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে কমিটিতে আরও আছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা শনিবার বিকালে জানান, জেলা প্রশাসন থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের তদন্তে করণীয় সম্পর্কে আমরা অবগত নই। তিনি জানান, পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, প্রতিবেদন দাখিল করতে তদন্ত কমিটি হিমশিম খাচ্ছে।
দিনাজপুরে শিশু মৃত্যুর খবর পেয়েই আইইডিসিআরের পরিচালকের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানের রোগতত্ত্ববিদ ডা. আহমেদ শহিদ শরীফ ও ডা. রাবেয়া সুলতানার নেতৃত্বে একটি গবেষণা দল ওই এলাকা পরিদর্শন করেন। তারা সেখানে ১৫ দিন অবস্থান করে মৃত শিশুর পরিবারের সদস্য ও এলাকার স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, স্থানীয় লিচুসহ অন্যান্য বাগানের গাছে ও মাটিতে বহু ধরনের অনুমোদিত ও অনুমোদনহীন বিষাক্ত কেমিক্যাল ছিটানো হয়।
রোগতত্ত্ববিদরা দুই দফায় আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেন। এলাকার শিশুদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ, লিচু বাগান পরিদর্শন এবং লিচু সংগ্রহ করেছেন।
শিশু মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ সম্পর্কে আইইডিসিআর রোগতত্ত্ববিদরা দেখতে পান, মৃত শিশুদের পরিবারগুলো দরিদ্র। এ কারণে তারা পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। লিচু বাগানের কীটনাশকের প্রভাব এবং পড়ে থাকা ফাটা লিচু শিশুরা কুড়িয়ে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
প্রসঙ্গত, দিনাজপুরে ২০১৩ সালে এ ধরনের লিচু খেয়ে ১৩ শিশু এবং ২০১২ সালে ১৪ শিশু মারা যায়। স্থানীয় চিকিৎসকরা মৃত্যুর কারণ ম্যানেনজাইটিস বলে জানায়। কিন্তু পরে পরীক্ষায় বিষাক্ত কেমিক্যালমিশ্রিত লিচু খেয়ে মৃত্যু হয়েছিল বলে নিশ্চিত হন রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া ২০০৯ সালে ঢাকার ধামরাইয়ে এবং ২০০৮ সালে নওগাঁয় লিচু খেয়ে বেশ কয়েকজন শিশু মারা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এবার দিনাজপুরের শিশুরা সেখানে খেলাধুলা করতে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা লিচু ও ভুট্টা কুড়িয়ে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুরা মারা যায়। পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, মৃতু শিশুদের প্রায় প্রত্যেকে খিচুনিতে আক্রান্ত হয়েছিল।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


