দুনীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও পচাগম আমদানির কেলেঙ্কারির হোতা খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলামের মন্ত্রিত্ব থাকবে কি থাকবে না তা আসলে নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের ওপর। দলীয় সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়ে বলে, এখন প্রধানমন্ত্রী যা করবেন তাই মেনে নেওয়া হবে।
সরকারের মন্ত্রিপরিষদের দুই সদস্যকে নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক উঠেছে। একজন দুর্নীতি আর একজন গম কেলেঙ্কারীর কারণে সমলোচনা ও তোপের মুখে পড়েছেন। তবে তারা সমালোচনায় মোটেই বিচলিত নন। নিজেদের অবস্থানে অবিচল রয়েছেন।
তাদের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, যতই সমলোচনা ও নৈতিকতার কথা মানুষ বলুক না কেন, নিজেরা কোন অপরাধ করেননি, সেটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। তাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে কেউ কেউ নজির স্থাপন করার কথা বললেও তারা কোন সমালোচনার মুখে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিবেন না। প্রধানমন্ত্রী বললেই তারা পদত্যাগ করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী না চাইলে যেমনটি আছেন তেমনি থাকবেন ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন।
দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম বলছেন, দুর্নীতির অভিযোগের কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার এই পদে থাকাই উচিত নয়। তিনি থাকতেও পারেন না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও মনে করেন মায়ার পদত্যাগ করা উচিত। তিনি পদত্যাগ করলে একটি নজির স্থাপন হতো।
দুদকের কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর দাবি মায়ার পদত্যাগের প্রশ্ন এখনই আসবে না। আপিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি থাকতে পারবেন। দুদকের আইনজীবী ও কমিশনার দুই জন দ্বিমত হলও মায়া কমিশনারের সঙ্গে একমত। তিনি পদত্যাগের কথা ভাবছেন না। বলেছেন, পদত্যাগের কোন সিদ্ধান্ত নেইনি। প্রয়োজনও হবে না। তাছাড়া বিষয়টিটিতো চূড়ান্ত কোনো নিস্পত্তি হয়নি। চূড়ান্ত নিস্পত্তি না হওয়ার কারণে কোন সিদ্ধান্ত প্রশ্নও আসছে না।
মায়ার দুর্নীতির বিষয়টি বিচারাধীন হলেও ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তার দুর্নীতির বিষয়টি বিচারাধীন। তাই তিনি যদি পদত্যাগ করতেন, তাহলে ভালো হতো। একটি নজির স্থাপিত হতো।
দুদক সূত্র আরো জানায়, তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা। আপিলও করেছে দুদক। যেখানে দুদকের কমিশনার বলছেন আপিল চলছে। এই কারণে তার পদত্যাগ করার প্রয়োজন হবে না। কারণ তিনি মামলায় অভিযুক্ত আসামী। সাজাপ্রাপ্ত এটা বলা যাচ্ছে না। মামলার চূড়ান্ত নিস্পত্তি হওয়ার পর তার শাস্তি হলে, আর মন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এখন তার পদত্যাগের প্রয়োজন হবে না। তিনি মন্ত্রী থাকতে পারবেন এতে কোন বাঁধা নেই।
মায়ার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, মায়া স্বেচ্ছায় ও নৈতিকতার প্রশ্নে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের কোন পরিকল্পনা ও চিন্তা করছেন না। প্রধানমন্ত্রী যদি এই ব্যাপারে কোন নির্দেশনা দেন তাহলে সেটাতে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। তেমন কোন নির্দেশনাও তার কাছে আসেনি।
এদিকে তিনি পদত্যাগের কথা না ভাবলেও ও মন্ত্রিপরিষদে আপিল নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত থাকতে পারবেন মনে করছেন। কিন্তু তার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী আকন্দ। তিনি মায়ার ব্যাপারে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন। সেখানে জানতে চেয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া কোন কর্তৃত্ববলে মন্ত্রী ও এমপিপদে বহাল রয়েছেন। মঙ্গলবার ৩০ জুন সকালে রেজিস্ট্রিযোগে ওই নোটিশ পাঠান।
দুদক কমিশনার যাই বলুক না কেন দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশিদ আলম বলেছেন, একটি দুর্নীতির মামলায় যেহেতু তার সাজা বহাল রয়েছে এই জন্য তিনি আর সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে কেউ সাজা পেলে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারান এটাই সংবিধানের বিধান। বর্তমানে তিনি একটি ফৌজদারি আপিল মামলার জামিনপ্রাপ্ত আসামি। তার মাথার ওপর একটি দণ্ড ঝুলছে। সংবিধানের ৬৬ (২) ঘ ধারা অনুযায়ী তার সদস্যপদ আর থাকে না।
এদিকে নিম্নমানের পচাগমের কারণে সমলোচনার মুখে রয়েছেন খাদ্য মন্ত্রী অ্যডাভোকেট কামরুল ইসলাম। তারও পদত্যাগ করা উচিত বলে মনে করছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা উচিত।
তার ব্যাপারে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গম নিয়ে খাদ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এটা প্রমাণ হয়েছে গম ভাল ছিল না। খারাপ গম আনার দায় তাকে নিতে হবে। তাই খাদ্যমন্ত্রীরও উচিত ছিল স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা। তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় তারা এই ঘটনায় জড়িত নন তাহলে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়তো।
এদিকে খাদ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ট সূত্র জানায়, এটা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। পদত্যাগের কোন প্রশ্নই আসে না। এদিকে ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম খাবার উপযোগী কি না তা পরীক্ষা করে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন হাইকের্টে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
গমের ব্যাপারে সমস্যার শুরু থেকে এই পর্যন্ত বেশ কয়েকবার পুলিশের তরফ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রবিবার এক চিঠিতে বলা হয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের সরবরাহ করা গমের আটা অত্যন্ত নিম্নমানের। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এসব নিম্নমানের গম ও আটা খাচ্ছেন। ফলে পুলিশ সদস্যদের মনোবল দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সেটা অব্যাহত থাকলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এর আগে একই অভিযোগে পুলিশের পক্ষ থেকে একই কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


