পচা গম আমদানি নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং দূর্নীতি মামলায় সাজার পরও বহাল থাকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার অপসারণের দাবি আরো জোরালো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ দেশের বিশিষ্টজনরা দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সর্বত্র এ দাবির প্রতি সমর্থন দিনদিন বাড়ছে।
তাদের মতে, দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের রেখে সরকার দিনবদলের সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তারা বলেছেন, গম কেলেংকারির পর অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে এখনও বহাল থাকার বিষয়টি বিস্ময়কর ও দুঃখজনক। অন্যদিকে উচ্চ আদালতে দোষ প্রমাণিত হওয়ায় আইনগতভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সংসদ সদস্য পদ আর নেই। নৈতিক কারণে মন্ত্রিসভা থেকে তারও পদত্যাগ করা উচিত। গণতন্ত্রের সভ্য রীতিনীতির স্বার্থে দু’জনেরই উচিত দ্রুত পদত্যাগ করা।
গম কেলেংকারির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলেন, দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীরা পার পেয়ে গেলে রাষ্ট্র ও সমাজে দুর্নীতি আরও জেঁকে বসবে। অপরাধ বাড়বে। সম্প্রতি ব্রাজিল থেকে পচা গম আমদানি নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। টিআইবিসহ বিভিন্ন মহল থেকে পদত্যাগের দাবি উঠলেও এখনও বহাল তবিয়তেই আছেন তিনি।
একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় সম্প্রতি দোষী প্রমাণিত হন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। আদালতের রায়ের পর সংবিধান বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, তিনি আর সংসদ সদস্য নন। তবুও বহাল রয়েছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।
এ প্রসঙ্গে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, দিনবদলের সনদ দিয়ে সরকার গঠন করা আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা এখন দেশটাকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। এসব দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীকে বহাল রেখে দিনবদলের সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমান বহুদিন আগে বলেছিলেন, ‘দেশ আজ বাজিকরদের হাতে।’ বাস্তবতাও এখন তাই। দেশ এখন দুর্নীতিবাজ-চাঁদাবাজ-নকলবাজদের হাতে। সরকার দেখেও না দেখার ভান করে আছে। এতে করে সবাই আরও ফ্রিস্টাইলে তাদের অন্যায় অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গম কেলেংকারির পরও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে এখনও বহাল আছেন, এটা সত্যিই দুঃখজনক। একইভাবে সর্বোচ্চ আদালতে দোষী প্রমাণিত হওয়ার পরও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব এবং সংসদ সদস্য পদ টিকে থাকার বিষয়টিও বিস্ময়কর।
এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, দেশে এখন ঘুষ এবং দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করা না গেলে দেশের মানুষের জীবনে শান্তি আসবে না। প্রায় অভিন্ন মন্তব্য করেন দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের রক্ষা করার মধ্য দিয়ে সরকার দুর্নীতিকে রাষ্ট্রীকরণ করছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থাই এখন লুটপাট ও দুর্নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দুই প্রধান দলের মধ্যে যে যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তারা কে কত দক্ষতার সঙ্গে লুটপাট ও দুর্নীতি করবে, সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। তিনি আরও বলেন,সরকারের ভাবখানা এমন, দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের বহাল রাখা না হলে দেশ অচল হয়ে যাবে। তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে রাষ্ট্র এবং সমাজে সুশাসন কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না।
বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অহরহ উত্থাপিত হচ্ছে। কিন্তু এ কারণে কখনও তারা কেউ পদত্যাগ করেন না। এতে করে রাষ্ট্র ও সমাজে দুর্নীতি করার প্রবণতা আরও বাড়ছে। অপরাধও বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, উন্নত দেশ এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্ত মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। এটাই সভ্য গণতান্ত্রিক রীতিনীতি। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এ সভ্য গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে দূরে রয়েছি।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, গম আমদানি নিয়ে অভিযোগ উত্থাপনের পরপরই খাদ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত ছিল। কিংবা তাকে সরিয়ে দেয়া উচিত ছিল। তাকে এখনও স্বপদে বহাল রাখা সত্যিই বিস্ময়কর ও দুঃখজনক। মন্ত্রীকে স্বপদে বহাল রেখে তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে না। তাই তাকে সরিয়ে দিয়ে বিষয়টি তদন্তে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একইভাবে উচ্চ আদালতে দোষী প্রমাণিত হওয়ার পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ারও উচিত ছিল মন্ত্রিসভা ও সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়ানো। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েই তার এ কাজ করা উচিত ছিল। ড. শাহদীন মালিক বলেন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াকে নির্দোষ ঘোষণা করে দেয়া হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগ বাতিল করেছেন। তাহলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে দেয়া রায়টা এখন বহাল রয়েছে। অর্থাৎ আইনের চোখে তিনি এখন দোষী এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামি। আর সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে যে কারাদ-জনিত অযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, সে কারণে তিনি এখন সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য নন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ে মায়ার পক্ষ থেকে হাইকোর্টে দায়েরকৃত আপিলটি পুনর্বহাল হয়েছে। কিন্তু হাইকোর্ট যখন তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছিলেন তখন তার আর জামিনের প্রয়োজন ছিল না। ওই জামিন এখন আর নেই। তাই তাকে আবার জামিন চাইতে হবে। এখন তার পক্ষে আগাম জামিন নেয়াও সম্ভব নয়। সেজন্য তাকে আগে আত্মসমর্পণ করে জেলে যেতে হবে। তারপর তাকে অন্তর্র্বতীকালীন জামিন চাইতে হবে।’
গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী অবিলম্বে খাদ্যমন্ত্রীর অপসারণ দাবি করে বলেন, গম কেলেংকারির পুরো দায় খাদ্যমন্ত্রীর। তিনি এখন নিজেকে বাঁচাতে এর-ওর ওপর দায় চাপাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত তাকে সরিয়ে দিয়ে পুরো বিষয়টি তদন্ত করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, একইভাবে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াকেও সরিয়ে দিতে হবে। আইনের বাস্তবায়নেই এটা জরুরি।
উল্লেখ্য, চলতি বছর মোট ৬ লাখ টন গম আমদানির জন্য ১২টি দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে ৪টি দরপত্রের বিপরীতে দুটি কোম্পানি (ইমপেক্ট ইন্টারন্যাশনাল ও ওলাম ইন্টারন্যাশনাল) ফেব্রুয়ারিতে প্রায় সোয়া ৪০০ কোটি টাকা দামের দুই লাখ টন গম ব্রাজিল থেকে আমদানি করে। এসব গমের আটা দিয়ে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের রেশন দেয়া হয়। পাশাপাশি টিআর-কাবিখার কর্মসূচিতেও বিতরণ করা হয়।
মূলত আইনশৃংখলা রক্ষাকারী একটি বাহিনীর পক্ষ থেকে পচা গমের অভিযোগ ওঠে। প্রথমে পুলিশ ও পরে বিভিন্ন সংস্থা থেকে লিখিতভাবে এ আটা গ্রহণে অসম্মতি জানানো হয়। এরপর খাদ্য অধিদফতরের পরীক্ষাগারে গমের মান পরীক্ষা করা হয়। খাদ্যমন্ত্রণালয়ের পক্ষ গম পচা নয়, খাওয়ার অনুপযোগী নয় বলে প্রচার চালানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসায় তিনি খাদ্য সচিবকে ডেকে পোকায় খাওয়া গম দেখিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্ত করে বের করারও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপরই মূলত নড়েচড়ে বসে খাদ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি এ গম খাওয়ার উপযোগী কিনা, তা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে অবহিত করার জন্য মঙ্গলবার খাদ্য সচিব ও খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ।
অন্যদিকে ২০০৭ সালের ১৩ জুন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক নূরুল আলম সূত্রাপুর থানায় আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করেন। সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধভাবে ২৯ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। পরের বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত দুইটি ধারায় মায়াকে মোট ১৩ বছরের কারাদ- দেন। সেই সঙ্গে তাকে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মায়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের শুনানি শেষে ২০১০ সালের ২৭ অক্টোবর তৎকালীন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি গোবিন্দচন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চ তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে রায় দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে দুদক আপিল করে। ১৪ জুন আপিল বিভাগ ওই নির্দোষ ঘোষণার রায় বাতিল করেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, ‘আপিল বিভাগের এ রায় অনুযায়ী এখন মায়ার সংসদ সদস্য পদ থাকে না। আর সংসদ সদস্য পদ না থাকলে তার মন্ত্রিত্বও থাকবে না। পাশপাশি তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দেয়ায় তাকে নতুন করে জামিন নিতে হবে এবং এজন্য তাকে আত্মসমর্পণ করে কারাগারেও যেতে হবে।
বিশেষ প্রতিনিধি,ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম


