আনোয়ারুল করিম॥
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং জেলে নিহত চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি নাম। তারই ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেই সঙ্গে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। কিন্তু তিনি এই সরকারের দেড় বছরের মেয়াদের মধ্যে একদিনও নিজ মন্ত্রণালয়ে বসে অফিস করেননি। দলের প্রতিও দায়িত্ব যথার্থভাবে পালন না করার অভিযোগ এখন পুরনো হয়ে গেছে। কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অপার শ্রদ্ধার কারণে তাদের পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবেই স্নেহ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার প্রমাণ প্রধানমন্ত্রী বারবারই দিয়েছেন। কিন্তু কেন সৈয়দ আশরাফ শেখ পরিবারের সেই ভালোবাসা-স্নেহের কোনো মর্ম বোঝেন না? কেন তিনি উন্নাসিক? এর জবাব কারও কাছেই কি নেই!
সৈয়দ আশরাফ একজন প্রতিভাবান রাজনীতিক। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য সরব থেকেছেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সৈয়দ আশরাফ নজরকাড়া ভূমিকা পালন করে দলের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনে অবদান রাখেন। আওয়ামী লীগের ২০০৯ সালের ২৪ জুলাইয়ের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এরপর ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর দলের সর্বশেষ সম্মেলনেও দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিরূপ পরিস্থিতিতে আয়োজিত নির্বাচনের আগে দেশি-বিদেশি সব চাপ মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগকে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আনতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি দলের সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকাও প্রশংসনীয় ছিল বলে জানান নেতা-কর্মীরা। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর আবার গাঢাকা দেন সৈয়দ আশরাফ। না মন্ত্রণালয়ে, না দলীয় কার্যালয়ে।
সৈয়দ আশরাফের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের রয়েছে অজস্র অভিযোগ। তারা বলেছেন, তাকে ফোন করলে ফোন ধরেন না। তার বিরুদ্ধে গণমাধ্যম কর্মীদেরও একই অভিযোগ। দলের সাধারণ সম্পাদক এবং মুখপাত্র হলেও সৈয়দ আশরাফের কাছ থেকে অধিকাংশ ইস্যুতে বক্তব্য পাওয়া যায় না। নেতা-কর্মীরা বলছেন, বিপদে-আপদে সাধারণ সম্পাদককে পাশে না পাওয়া, দলীয় ও সাংগঠনিক কাজে নিষ্ক্রিয় থাকা, এমনকি দিনের পর দিন তার বাসায় গিয়ে তার সাক্ষাৎ না পেয়ে ফিরে আসার বেদনা রয়েছে তাদের অনেকের মনে।
বর্তমান সরকার গঠন হওয়ার পর থেকে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ একদিনও সচিবালয়ে নিজের দফতরে যাননি। এর আগের সরকারের আমলেও তিনি হাতেগোনা কয়েকদিন সচিবালয়ে অফিস করেছেন বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
গত বছরের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে পর ১২ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা গঠন হয়। এর আগের সরকারের ধারাবাহিকতায় এবারও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন এবং সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সৈয়দ আশরাফ। ওই মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মন্ত্রীর স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয় ফাইল বাসায় পাঠানো হয়। মন্ত্রিসভা বৈঠকে সচিবালয়ে এলেও নিজ মন্ত্রণালয়ে বসেন না সৈয়দ আশরাফ।
মন্ত্রীর প্রাত্যহিক কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমকে জানান, দেশে থাকলে সাধারণত মন্ত্রিসভা বৈঠকে নিয়মিতই অংশ নেন সৈয়দ আশরাফ। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে হওয়া জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতেও নিয়মিত যান তিনি। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে দাফতরিক উপস্থিতির বিষয়ে শিথিলতা এ সরকারের আমলে আরো বেড়েছে।
মন্ত্রণালয়ে দাফতরিক কাজে সহায়তা করার একান্ত সচিবও নিয়োগ দেওয়া হয়নি তার। যদিও ওই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক মাধব রায় অনানুষ্ঠানিকভাবে একান্ত সচিবের কাজগুলো করে যাচ্ছেন।
মঙ্গলবার ৭ জুলাই সাপ্তাহিক ‘জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি’ (একনেক)-এর বৈঠকে সৈয়দ আশরাফের অনুপস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন বলে জানা গেছে। ওই সময়ে তাকে বর্তমান মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তাৎক্ষনিক ইঙ্গিতও দেন। এরপর থেকেই মিডিয়াতে সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে গুঞ্জন ওঠে।
এলজিআরডি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, একনেক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর এমন মনোভাব প্রকাশের পর সৈয়দ আশরাফ নিজে থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র নিয়ে যান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তার সেই পদত্যাগপত্র রাখেননি। সেখান থেকেই সৈয়দ আশরাফ কিশোরগঞ্জে রওনা হন।
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



