জাকাতের কাপড় নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়িতে পদপৃষ্ট হয়ে নারী ও শিশুসহ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ঘটানাস্থল থেকে পুলিশ ১৩টি লাশ হাসপাতালে পাঠানোর পরে পুলিশ আরো ১২ জনের মৃতদেহের হদিশ পায়। সেহিসেবে পুলিশের কাছে মরদেহ রয়েছে ২৩টি। তবে পুলিশ আসার আগেই স্বজনরা আরোও কয়েকজনের মরদেহ নিজেরাই নিয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। নিয়ে যাওয়া মরদেহের সন্ধানে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে।
ময়মনসিংহ পৌর এলাকার অতুল চক্রবর্তী রোডে নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরির মালিকের বাসায় শুক্রবার ভোর পাঁচটার দিকে এই ঘটনা ঘটে।
কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ফ্যাক্টরির মালিক শামীম তালুকদারসহ সাতজনকে আটক করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার (এসপি) খোন্দকার মইনুল হক জানান, আহতদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পদদলিত হয়ে যে ২২ জন নিহত হয়েছেন, এর মধ্যে ২০ জনই নারী। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। তারা হলো ছিদ্দিক (১২) ও লামিয়া (৫)। বাকি ২০ জন বিভিন্ন বয়সী নারী। ওসির দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ১৯ জন হলেন ফজিলা বেগম (৭৫), হাজেরা (৭০), রহিমা বেগম (৬৫), ফাতেমা বেগম (৬০), রিনা রানী দে (৬০), সৃষ্টি রানী সরকার (৫৫), জোহরা খাতুন (৫২), নাজমা বেগম (৫০), খোদেজা (৫০), হামিদা বেগম (৪৫), ফাতেমা বেগম (৪২), সখিনা (৪২), শাহারন বেগম (৪০), রিজিয়া আক্তার (৪০), মমতাজ বেগম (৪০), সুফিয়া বেগম (৩৫), সামু বেগম (৩৫), আদুরি বেগম (৩৫) ও রুবিয়া আক্তার (২২)। অপর জন অজ্ঞাতনামা নারী।
পদদলনের ঘটনা সম্পর্কে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক সঞ্জীব কুমার চক্রবর্তীর ভাষ্য, এলাকার ব্যবসায়ী ও নুরানি জর্দা ফ্যাক্টরির মালিক শামীম তালুকদার প্রতি বছরই জাকাতের কাপড় দেন। আজ তাঁর বাড়িতে জাকাতের কাপড় দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময় নির্ধারণ করা ছিল না। এ কারণে সেহেরির পর থেকে সেখানে দুস্থ মানুষের ভিড় জমতে থাকে। শামীম তালুকদারের বাড়ির সামনের রাস্তাটি তেমন চওড়া নয়। অতিরিক্ত মানুষের চাপ ঠেকাতে ভোর পাঁচটার দিকে ওই বাড়ির প্রবেশ ফটক খুলে দেওয়া হয়। এ সময় হুড়োহুড়ি করে বাড়ির ভেতর ঢুকতে গিয়ে কেউ কেউ পড়ে যান। এতে পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
সঞ্জীব কুমার চক্রবর্তী বলেন, ওই ঘটনার পর স্বজনেরা নিহতদের লাশ নিয়ে যায়। এ কারণে এ দুর্ঘটনায় ঠিক কত জন নিহত হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অস্বাভাবিক মৃত্যু হওয়ায় এসব লাশের ময়নাতদন্ত প্রয়োজন। এ জন্য স্বজনদের নিয়ে যাওয়া লাশগুলো উদ্ধার করতে পুলিশ বিভিন্ন বস্তিতে তল্লাশি চালাচ্ছে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি কামরুল ইসলাম জানান, তারা সকালে ঘটনাস্থল থেকে ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডেকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছেন। তবে আরও বেশ কিছু লাশ স্বজনরা ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে গেছেন।
ওসি বলেন, আগে থেকে আজ জাকাতের কাপড় দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া ছিল। রাত থেকেই সেখানে ভিড় বাড়তে থাকে। সেহরির পর কারখানার গেইট খোলার সঙ্গে সঙ্গে নারী-পুরুষ একসঙ্গে ঢোকার চেষ্টা করলে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এক পর্যায়ে পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
সকালে ওই কারখানার সামনে বহু মানুষের স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা যায়। রিকশা ও ভ্যানে করে হতাহতদের নিয়ে যাওয়া হয় মেডিকেলে।
স্থানীয়রা জানান, পৌরসভা কার্যালয়ের পাশে নূরানী জর্দা কারখানায় প্রতিবছরই জাকাতের কাপড় দেওয়া হয়। এবারও শুক্রবার সকালে কাপড় দেওয়ার কথা থাকায় পাশের বস্তি এলাকা, এমনকি ব্রহ্মপুত্রের চর থেকেও হাজারখানেক নারী-পুরুষ রাতেই সেখানে ভিড় করে।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, সেহরির আগে থেকেই মানুষের কলরবে পুরো এলাকা গমগম করছিল। এরপর এক সময় আর্তনাদ শোনার পর বাইরে গিয়ে হুলস্থুল। আসলে কোনো নিয়ম মানা হয়নি, কেউ লাইন করে দাঁড়ায়নি। সবাই গেটের সামনে জটলা করেছিল। গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে সবাই ভিতরে প্রবেশ করতে গিয়েই এই ঘটনা ঘটে।
প্রসঙ্গত, এর আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে জাকাত দিতে গিয়ে এভাবে অব্যবস্থাপনায় মানুষকে খুন করার ঘটনা ঘটেছিল।
সংবাদদাতা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


