সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি দলীয় সভানেত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তারপরেও তাকে যেতে হল। আশরাফের অব্যাহতির পর পরিবর্তনের পথরেখা তৈরি করলেন দলের সভানেত্রী। গুঞ্জন চলেছ পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়বেন আরো কয়েকজন বিতর্কিত মন্ত্রী।
সে তালিকায় নাকি মায়া-কামরুলও আছেন এমন গুঞ্জনও চলছে ক্ষমতাসীন দলটির ভেতরে। শুধু মন্ত্রীরাই নয়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেও আসবে পরিবর্তন। দলের নিষ্ক্রিয় নেতাদের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। এই সব নেতা জাতীয় সম্মেলনের পর দলের পদ-পদবি হারাবেন। এ বছরের ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর পরিবর্তনের পথরেখা তৈরি হয়েছে বলে কয়েকজন শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে সবার জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি এই বার্তার মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ, বিতর্কিত ও নিষ্ক্রিয়দের সরকার এবং দল থেকে বাদ দিয়ে দল গোছানোর পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিয়েছেন। নিষ্ক্রিয়তার কারণে শাস্তি পেয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ঈদের পর দুর্নীতি ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হবে। এ অবস্থায় দলীয় কর্মকাণ্ডে নিজেকে সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
একাধিক মন্ত্রী বলেছেন, মন্ত্রিত্বের ‘ভারমুক্ত’ হওয়ায় সৈয়দ আশরাফ দলের জন্য বেশি কাজ করতে পারবেন। অর্থমন্ত্রীও এমন কথাই বলেছেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতারা বলেছেন, সৈয়দ আশরাফের সততা ও আস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কোনো ক্ষোভ নেই। তিনি তার নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন। গত মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে তার অনুপস্থিতির কারণেই প্রধানমন্ত্রী তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিষয়টি তা নয়। কমপক্ষে তিন মাস আগেই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় একজন মন্ত্রীকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ থাকায় বাদ পড়তে পারেন আরেকজন মন্ত্রী। সাংবাদিকদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে আলোচনায় থাকা একজন মন্ত্রীর ভাগ্যও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। এর মধ্যে সরকারের প্রধান শরিক দলের একজন নেতাও রয়েছেন।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, সংসদের গত অধিবেশনে সরকারি দলের প্রশ্নবিদ্ধ লোকজনের কারণে আর্থিক খাতে দুর্নীতি ঠেকানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ এনেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
এ ছাড়াও কিছুদিন ধরে এমন গুরুতর অভিযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতিতে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে জেলা ও থানা পর্যায়ে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের কমিটি গঠনের অভিযোগ রয়েছে।
দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন হবে।
সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য নুহ-উল-আলম লেনিন জানিয়েছেন, ৫৩টি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলন হয়েছে। অন্য জেলাগুলোর সম্মেলনের পর নির্ধারিত সময়ে জাতীয় সম্মেলন হবে। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দুর্নীতিবাজ নেতারা বাদ পড়বেন বলে দলের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন।
এদিকে বর্তমান মন্ত্রিসভায় অনেক মন্ত্রীকে নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দুর্নীতি মামলার সাজা আর গম কেলেঙ্কারি নিয়ে সাম্প্রতিককালে চরম বিতর্কে পড়েন দুই মন্ত্রী। কিন্তু তাদের কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে হঠাৎ করেই ব্যবস্থা নেয়া হলো সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এতে বেশ অবাক হয়েছেন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। সৈয়দ আশরাফের মন্ত্রিত্ব হারানোর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চালাচ্ছেন তারা।
দলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা হোসেন পুতুলের শ্বশুর ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে এ মন্ত্রণালয়টি পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলেন। মঙ্গলবারের একনেক বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সেই আগ্রহের কথা প্রকাশ করেন এবং অবশেষে বৃহস্পতিবার তাকে সেই দায়িত্ব দেন।
সূত্রটি আরো জানায়, স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক শাসনামলে দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাই এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কিন্তু খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দলে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ নেই। তাই দলের আগামী কাউন্সিলে হয়তো তাকে বড় কোনো পদে নিয়ে আসা হতে পারে। এর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে তার একটা ইঙ্গিত দেয়া হলো।
তবে অসমর্থিত একটি সূত্র জনায়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে খন্দকার মোশাররফ হোসেন সফল হতে পারেননি। কারণ, তার সময়ে মালয়েশিয়া, দুবাই, সৌদি আরব ও কুয়েতসহ বাংলাদেশের বড় বড় শ্রমবাজারগুলোতে জনশক্তি রফতানিতে ধস নেমেছে। বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারকরা জনশক্তি রফতানির স্বার্থে তাকে সরিয়ে দিতে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেনদরবার করছেন। আর মোশাররফ হোসেন যেহেতু স্থানীয় সরকার মন্ত্রাণালয়ে আগ্রহী সেহেতু কৌশলে তাকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রাণালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হলো। আপাতত তিনি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে থাকলেও শিগগিরই সেখানে নতুন মন্ত্রী দেয়া হতে পারে বলে জানায় সূত্রটি।
আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় সম্পাদকম-লীর একজন সদস্যের মতে, সৈয়দ আশরাফকে সরিয়ে দিয়ে এক দিকে যেমন মায়া ও কামরুলের ইস্যুটি আপাতত সামাল দেয়া হয়েছে তেমনি তারাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত অন্য মন্ত্রীদেরও রেড সিগন্যাল দেয়া হলো। এর মধ্য দিয়ে সরকারের ইমেজ রক্ষায় কাউকেই ছাড়া হবে না এমন বার্তাটিই দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে আওয়ামী লীগ সম্পাদকম-লীর এক সদস্য আশরাফের দফতরবিহীন হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেই এই পরিবর্তন। সামনে হয়তো আরো চমক অপেক্ষা করছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


