আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্তর ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ দেশ-বিদেশের নানান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হওয়ার পর, কলকাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে রিলিজ করার এক সপ্তাহের মধ্যে বিতর্কে জড়িয়ে গেল ৷ ইন্টারনেটে, সোস্যাল নেটওয়ার্কে অভিযোগ উঠছে, ইরানি ছবি ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ম্যারেড কাপ্ল’ থেকে ‘কপি’ করে ছবি বানিয়েছেন আদিত্যবিক্রম৷ কেউ কেউ তির্যকভাবে ফেসবুক-এ লিখছেন, তামিল ছবি থেকে টুকলে রিমেক, আর ইরানি ছবি থেকে টুকলে ওরিজিন্যাল!
ঘটনা এটাই যে ইটালো কালভিনোর ছোটগল্প ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ আ ম্যারেড কাপ্ল’ নিয়েই ছবি তৈরি করেছেন আদিত্যবিক্রম এবং ইরানের পরিচালক কেওয়ান করিমি৷ করিমির ছবি স্বল্পদৈর্ঘ্যের এবং আদিত্যবিক্রমের ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ পূর্ণদৈর্ঘ্যের৷ দুটো ছবিই তৈরি হয়েছে ২০১৩ সালে৷ নির্মাণগত দিক দিয়ে সাদৃশ্য আছে দুটো ছবির মধ্যে৷ এবং দুটো ছবিই সংলাপহীন৷ করিমির ছবির দম্পতির মধ্যে স্ত্রী কাজ করে দিনেরবেলায় একটি পানীয় বোতলজাত করার কারখানায় এবং স্বামী নাইট ডিউটি করে একটি ম্যানিকুইন তৈরির কারখানায়৷ আদিত্যবিক্রমের ‘আসা যাওয়ার মাঝে’র স্ত্রী (বাসবদত্তা) কাজ করে দিনেরবেলায় একটা ব্যাগ তৈরির কারখানায়, আর, স্বামীর (ঋত্বিক চক্রবর্তী) নাইট ডিউটি খবরের কাগজের ছাপাখানায়৷
এই সমস্ত মিল উদ্ধৃত করে ফেসবুক যখন বিতর্কময় ও আক্রমণাত্মক, তখন আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্তর বক্তব্য কী? তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে আদিত্যবিক্রম স্পষ্টভাষায় জানান, ফেসবুকের আক্রমণকে আমি গ্রাহ্য করি না৷ কিন্তু কলকাতা থেকে যে অসভ্যতামি, নোংরামি শুরু হয়েছে, সেটা লজ্জার৷
কী নোংরামো? প্রশ্ন করতে আদিত্যবিক্রম বললেন, ইরানের পরিচালক কেওয়ান করিমি আমার বন্ধু৷ আমার ছবি এখানে রিলিজ করার পরে করিমির সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ করে অভিযোগ করছেন কলকাতার বহু মানুষ৷ করিমি আমাকে জানান, গত এক সপ্তাহে অনলাইনে তাঁর ওই ছবিটা দেখার হিড়িক পড়ে গেছে৷ এবং কলকাতা থেকে করিমিকে মেসেজ করে বলা হচ্ছে, সে বলুক যে আদিত্যবিক্রমের ‘লেবার অফ লাভ’ (‘আসা যাওয়ার মাঝে’র ইংরেজি নাম) তার ছবি ‘অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ম্যারেড কাপ্ল’ থেকে টোকা৷ করিমি যখন এই কথা লিখতে অস্বীকার করছে, তখন তাকে বলা হচ্ছে তাহলে তুমি স্বীকার কর যে ‘লেবার অফ লাভ’ থেকে তুমি কপি করেছ৷ কলকাতার এই অসভ্যতামি এবং নোংরামোকেই আমি লজ্জার বিষয় বলে মনে করছি৷
কলকাতা থেকে কারা করিমিকে মেসেজ করছেন? নামগুলো জানেন?
প্রশ্ন করতে আদিত্যবিক্রম বললেন, জেনেছি৷ কিন্তু সেই নামগুলো আমি বলতে চাই না৷ সেইসব নাম জেনে আমি বিস্মিত হয়ে গেছি৷ এই ঘটনায় করিমি পুরোপুরি আপসেট৷ করিমি এমনকি আমাকে জানিয়েছে, এটা তো এগেইনস্ট হিউম্যানিটি৷
কিন্তু এতটা মিল কীভাবে হল দুটো ছবিতে?
উত্তরে আদিত্যবিক্রম বললেন, দেবদাস নিয়ে যদি তিনটে ছবি হয়, তাদের মধ্যে কি মিল থাকবে না? আমরা তো একই গল্প নিয়ে ছবি করেছি৷ দু’পাতার একটা গল্প থেকে আমি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করেছি৷ করিমির ছবি স্বল্পদৈর্ঘ্যের৷ এই একই গল্প নিয়ে ব্রাজিলে, আর্জেন্টিনায় এমনকি পুনের এফ টি আইতে ডিপ্লোমা ফিল্মও হয়েছে৷ সবগুলোই অবশ্য শর্ট ফিল্ম৷ একই গল্প নিয়ে একাধিক ছবি হওয়া তো আশ্চর্যের নয়৷
–তুমি করিমির ছবিটা দেখেছ?
–হ্যাঁ, সাত-আটদিন আগে দেখেছি৷ (আমাদের এই কথাবার্তা বুধবার, ৮.৭.১৫-য়)
–করিমির সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব কীভাবে?
–দেশ-বিদেশে আমার প্রচুর বন্ধু আছে৷ আমি এই গল্পটা নিয়ে ছবি বানাচ্ছি জেনে করিমি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে৷ সেই থেকেই বন্ধুত্ব৷ আমার ছবিটাও ভেনিসের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে করিমি দেখেছে৷ ভেনিসের খবরের কাগজে একটা আর্টিকেলও বেরিয়েছিল আমাদের দুজনের ছবি নিয়ে৷ সেখানে লেখা হয়েছিল, করিমি তাঁর ছবিতে দুজনকে (ওই স্বামী, স্ত্রীকে) দেখা করতে দিয়েছে, আদিত্য দেয়নি৷ করিমির ছবিতে একটা দৃশ্যে দুজনে একসঙ্গে খেতে বসেছে৷ আমি দুজনকে একসঙ্গে এভাবে দেখাইনি৷ এটাই লেখা হয়েছিল৷
–করিমির ছবিও সংলাপহীন৷ তোমার ছবিও সংলাপহীন৷ এটা কী করে হল? এটা কি কাকতালীয়?
–সেটা কাকতালীয় ছাড়া আর কী? আমি তো আপনাকে আগের সপ্তাহেই বলেছিলাম, প্রথমে কিছুটা সংলাপ ছিল আমার ছবিতে৷ পরে সেটা বাদ দিই৷ ছবিতে একটা গানও রেখেছিলাম প্রথমে৷ ঋত্বিকদা (ঋত্বিক চক্রবর্তী, এ ছবির প্রধান অভিনেতা) জানে৷
এরপর আদিত্যবিক্রম বলেন, দেখুন করিমির ছবি অফিসিয়ালি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ সালের অক্টোবরে৷ (উইকিপিডিয়া অবশ্য বলছে, মে, ২০১৩.) আমার ছবি ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ ২০১৩-র আগস্টে শেষ হয় এবং আমি সেপ্টেম্বরে বার্লিন ফেস্টিভ্যালে পাঠাই৷ এখন এইসব অভিযোগ তুলে নোংরামো করা হচ্ছে৷ আমি সেগুলো গ্রাহ্য করি না৷ ৫০টার ওপর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আমি ছবিটা পাঠিয়েছি৷ তেহরানেও আমার ছবি দেখানো হয়েছে৷ বহু প্রশংসা পেয়েছি৷ পুরস্কার পেয়েছি৷ দুটো জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি৷ এখন এইসব অভিযোগ শুনে আমি কোনও উত্তর দিতে চাই না৷ যদি অভিযোগকারীরা বলেন, এত মিল কেন? তাহলে বলতে চাই, আমরা দুজনে মিলিতভাবে বানিয়েছি! বেশ করেছি, বানিয়েছি৷ আর কিছু বলার আছে? এটাই আমার প্রশ্ন কুৎসাকারীদের প্রতি৷
তারই আগে এত অভিযোগ ও বিতর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আদিত্যবিক্রম বললেন, আমি নীরবেই আমার কাজ করে যেতে চাই৷ হইচই করাটা আমার কাজ নয়৷ আর, কলকাতার যে সব মানুষ কুৎসা করছেন, তাঁরা অন্ধকার কুয়োতে থেকে নিজেদের এন্টারটেনমেন্টের বন্দোবস্ত করছেন৷ তাঁরা সেটাই করুন৷
আগামী সপ্তাহেই লন্ডন যাচ্ছেন আদিত্যবিক্রম৷ ওখানে চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হবে ‘আসা যাওয়ার মাঝে’৷
নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


