সিলেটের ১৩ বছর বয়সী শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন জাতীয় ক্রিকেট দলের টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম।
‘একটি নিষ্পাপ শিশুকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার মতো বড় অপরাধ মনে হয় আর নেই’ উল্লেখ করে সবার প্রতি মুশফিকের আহ্বান ‘শিশু নির্যাতনকে না বলুন!’।
সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে নিজের ফেসবুকে পোস্ট করা একটি প্রতিবাদী ছবি আপলোড করে এর ক্যাপশনে মুশফিক এ আহ্বান জানান।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, লাল শার্ট-কালো প্যান্ট পরা মুশফিকের হাতে একটি প্ল্যাকার্ড, যাতে লেখা ‘সে নো টু চাইল্ড এবইউজ’ (শিশু নির্যাতনকে না বলুন)!
আর ছবিটির ক্যাপশনেই রাজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মুশফিক।
গত বুধবার সকালে সিলেট নগরীর কুমারগাঁওয়ে রাজনকে ভ্যান গাড়ি চুরির অপবাদে খুঁটির সাথে বেঁধে লোহার রোল দিয়ে পিটিয়ে ও খুঁচিয়ে শিশু রাজনকে হত্যা করা হয়।
রাজনকে নির্যাতন করে হত্যার দৃশ্য ভিডিও করে খুনীরা।
এই ভিডিওতে দেখা গেছে, ধবার সকাল ৭টার দিকে খুঁটিতে বেঁধে রাজনকে নির্যাতন করা হচ্ছে। ভিডিওচিত্রে তিন-চারজনের কণ্ঠস্বর শোনা গেলেও ভিডিওতে দুজনের চেহারা দেখা গেছে। ওই দুজন রোলার দিয়ে রাজনের মাথা থেকে পা পর্যন্ত থেমে থেমে আঘাত করছিল।
‘এই ক (বল) তুই চোর, তোর নাম কৃ লগে কারা আছিলৃ’ ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চেয়ে মারধর করা হয়।
ভিডিওতে ঘাতকদের বলতে শোনা গেছে, ‘কোন সিস্টমে তরে মারতাম খ, আমরার হখল সিস্টম জানা আছে’। (তোকে কীভাবে মারব বল, আমরার সব পদ্ধতি জানা আছে)।
এক পর্যায়ে ঘাতকরা রোল দিয়ে রাজনের পায়ে পেটাতে থাকে আর জিজ্ঞেস করে সে ‘খুশি’ কিনা। এসময় রাজন কাতর সুরে বলে, ‘আড্ডিত মাইর না রেবা, এখটা মারছ খুশি অইছি’। তখন ঘাতকদের একজন বলে, ‘এখটা খাইছ খুশি, দুইটা খাইলে ডবল খুশি’! এই বল তারা উল্লাসে ফেটে পড়ে।
ভিডিও চিত্রের মাঝামাঝি সময় দেখা যায় ঘাতকরা বারবার কিশোর রাজনের পুরষাঙ্গে রোলার দিয়ে খোঁচাচ্ছে। সেখানে রোলার দিয়ে গুতা দিচ্ছে, আঘাত করছে। যন্ত্রণায় চিৎকার করছে রাজন আর ঘাতকরা অশ্লীল মন্তব্য করে উল্লাস করছে।
একনাগাড়ে প্রায় ১৬ মিনিট রাজনকে অনেকটা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রোল দিয়ে পেটানো হয়। একপর্যায়ে মাটিতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে পানি খাওয়ার আকুতি জানায় রাজন। কিন্তু পানির বদলে ‘ঘাম খা’ বলে মাটিতে ফেলে রাখা হয় তাকে।
কয়েক মিনিটের জন্য রাজনকে হাতের বাঁধন খুলে রশি লাগিয়ে হাঁটতে দেওয়া হয়। ঘাতকরা ভেবেছিল, এত নির্যাতনের পর তার আর হাটার শক্তি নেই। সে মাটিতে ধপ করে পড়ে যাবে। কিন্তু ভয়ে হাটতে থাকা শিশুটিকে উদ্দেশ করে তখন তারা বলে, ‘আড়গোড় (হাড়গোড়) দেখি এখনো ঠিক আছে, ইগুরে (ওকে) আরও মারোৃ’।
এরপর রাজনের বাঁ হাত খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে আরেকদফা পেটানো হয়। এসময় রাজনের শরীর ও চোখ-মুখ বেশ ফোলা দেখা গেছে।
এইভাবে দফায় দফায় শিশুটির নখে, মাথা পেট ও উড়োসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে রোল দিয়ে আঘাত করা হয়। এক সময় বাঁ হাত ও ডান পা ধরে মোচড়াতেও দেখা যায়।
ভিডিওটি এতটাই নির্মম আর পৈশাচিক, সিনেমার ভিলেনরাও এই নিপীড়ন দেখে আতকে উঠবে। কিন্তু এতটুকু গায়ে লাগেনি। এতটুকু দয়া হয়নি ঘাতকদের। তারা তাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়েছে।
ঘাতকরা বলেছে, ‘তরে এমন শিক্ষা দিমু, হালার হালা (শালার শালা) জীবনে আর চুরি খরতে (করতে) ফারতে (পাড়বে) নায় (না)’।
এদিকে রাজনকে যে ভিডিও ধারণ করার কাজটি করছিল, তাকে নির্দেশ করে নির্যাতনকারীরা জানতে চায় ঠিকমতো ভিডিও ধারণ হচ্ছে কি-না। ওপাশ থেকে ‘ফেসবুকে ছাড়ি দিছি, অখন সারা দুনিয়ার মানুষ দেখবৃ’ বলতে শোনা গেছে।
শেষ দিকে নির্যাতনকারী একজন সঙ্গীদের কাছে জানতে চায়, ‘কিতা করতাম?’ বলে। অপর একজনকে তখন ‘মামায় যে কইছন, ওই কাম করি ছাড়ি দে!’ বলতে শোনা যায়।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


