জাতীয় পতাকাকে ‘জায়নামাজ’ বানিয়ে নামাজ আদায়কারী একজনের ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে চলছে নানামুখী বিতর্ক। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের শেষ ওয়ানডের সময় চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামে এক দর্শকের এই নামাজের ছবি এখন ফেসবুকের কল্যাণে ঘুরছে আলোচনার টেবিলে। ধর্মীয় বিধি অনুসারে জায়নামাজ হিসেবে কি ব্যবহার করা যাবে তার সুস্পষ্ট বিধান থাকলেও বিষয়টি নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।
জাতীয় পতাকা একটি দেশের পরিচিতি এবং অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিধি রয়েছে। সেই বিধি অনুযায়ী জাতীয় পতাকাকে পদদলিত করা যায় না।
অনেকে বলেছেন, ইসলামের দৃষ্টিতেও দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। “হুব্বুল ওয়াতানে মিনাল ঈমান”। সেই হিসেবে জাতীয় পতাকাকে সম্মান জানানো দেশপ্রেমেরই অঙ্গ।
ফেসবুকে কেউ কেউ বলেছেন, জায়নামাজ হিসেবে কি ব্যবহার করা যাবে কি যাবে না- তার একটা রীতি আছে। সে হিসেবে জাতীয় পতাকাকে জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কি না তা নিয়েই মূলত বিতর্কের সূত্রপাত।
ফেসবুকের এক পোস্টে আলোচিত ছাত্রনেতা বাপ্পাদিত্য বসু’র একটি মন্তব্য নিয়ে কেউ কেউ সমালোচনা করছেন। অনেকেই অবশ্য বাপ্পাকে সমর্থনও করেছেন। বাপ্পাদিত্য বসু শুক্রবার নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমকে বলেছেন, আমি একজনের একটি ছবি শেয়ার করেছিলাম এবং মন্তব্য করে লিখেছিলাম ‘বিসিবি এন্ড পুলিশ, ফাইন্ড দিস … এন্ড হ্যাং হিম’।’ এদিকে জাতীয় পতাকাকে জায়নামাজ বানানোর এই ছবি নিয়ে অনেকেই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে কট্টর মন্তব্য করেন; যা প্রকারান্তরে ধর্মীয় মৌলবাদীত্বকেই উসকে দেয়।
তবে ফেসবুকের বিভিন্ন মন্তব্যে অনেকেই কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কড়া ভাষায় জবাবও দিয়েছেন। ধর্ম ও দেশকে এক না করারও আহ্বান এসেছে তাদের বক্তব্যে। তারা বলেছেন, দেশের নামে যেমন ধর্মকে অবমাননা করা যায় না, তেমনি ধর্মে নিজ দেশের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা দেখানোরও নজির রয়েছে।
ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনাদর্শ ও স্বভাব-চরিত্রে দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি নিজের মাতৃভূমি পবিত্র মক্কা নগরীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই স্বজাতি কর্তৃক নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বিতাড়িত হয়ে জন্মভূমি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকালে বারবার মক্কার দিকে ফিরে তাকিয়ে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে আফসোস করে বলেছিলেন, ‘হে আমার স্বদেশ! আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’
ফেসবুকে আরেকজন মন্তব্য করেছেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পর অনেক রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন-সার্বভৌম আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেয়েছে হিজল-তমাল, তরুলতা আর সবুজ-শ্যামলতায় ঘেরা রূপসী বাংলাদেশ। বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের আত্মপরিচয় ঘটেছে স্বাধীন জাতি হিসেবে।
ফেসবুকে আরেকজন দীর্ঘ মন্তব্যে বলেছেন, “প্রকাশ হওয়া ছবিতে দেখলাম, একটা লোক চট্টগ্রামে খেলা চলাকালীন সময়ে লাল-সবুজের কাপড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকেই বলছে এটা জাতীয় পতাকার অবমাননা আবার অনেকেই বলছে পবিত্র কাজ করতে গিয়ে পবিত্র জিনিস ব্যবহার করেছে এখানে আপত্তির কী! জাতীয় পতাকা বলতে যদি সঠিক মাপজোকে যাওয়া হয় তাহলে এটার অনুপাতিক হার আছে। অনুপাতিক হার মেনেই পতাকা তৈরি করতে হয়। তবে একদৃষ্টিতে যদি দেখা হয় তাহলে বলতে হবে চোখ বলছে এটা সঠিক মাপেরও যদি না হয় তবে কাছাকাছি পর্যায়ের, এবং হয়ত পতাকা হিসেবেও ব্যবহৃত! তাহলে এটা কী জাতীয় পতাকা? পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে কে কীভাবে দেখছে তার ওপর। এ বিষয়ে উল্লেখ করা যায়, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গা সাজানো হয় কাগজের পতাকা দিয়ে। এসব পতাকা বাজার থেকে কেনা এবং নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি এসব সঠিক মাপের নয়। তবু প্রশাসন একে পতাকা হিসেবেই ব্যবহার করে থাকে এবং আমরাও সেভাবে তা জ্ঞান করি, সম্মান করি, আবেগে উদ্বেলিত হই। এক্ষেত্রে কেউ কখনও গজ ফিতা নিয়ে এগিয়ে আসে না মাপ সঠিক কীনা তা পরিমাপ করতে, এটা সম্ভবও নয়। তাই সঠিক মাপের না হলেও এ দেশে জাতীয় পতাকা বিভিন্নভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। যে লোক জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহার করে নামাজে দাঁড়ালো সেটা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার আদলে এবং চোখের মাপ দিয়ে যদি দেখি তবে সেটা জাতীয় পতাকার মতোই। সুতরাং কাজটা গর্হিত এবং নিন্দাযোগ্য সন্দেহ নেই। অদ্য যারা বলছে পবিত্র কাজ করতে গিয়ে পবিত্র জিনিসই ব্যবহার করেছে তাদের জ্ঞানের সীমা-পরিসীমা দেখে মুগ্ধ হয়েই বলি ধর্ম পালন তার একান্ত ব্যক্তিগত কিন্তু পতাকা আর বাংলাদেশ এটা ব্যক্তি সীমা অতিক্রম করে সামষ্টিক এবং সব সময়ের শ্রদ্ধাযোগ্য। সেক্ষেত্রে তার ব্যক্তি কর্মপালনের জন্যে সামষ্টিক কিছুকে অগ্রাহ্য, অপমান, অশ্রদ্ধা করার কোন সুযোগ, কোন অধিকার থাকতে পারে না। এক্ষেত্রে ধর্ম আর দেশ কি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে? তবে আমি এক্ষেত্রে এ দুইকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে ইচ্ছুক নই কারণ দেশ যেখানে সার্বজনীন সেখানে ধর্মের মতো ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ব্যাপারকে সামনে নিয়ে আসার কোন মানে নাই। তবে যারা ‘পবিত্র কাজ’ নামক জাস্টিফিকেশন তত্ত্ব ছড়িয়ে পতাকা অবমাননাকে হালকা করতে এবং দেশ-ধর্ম এ দুইকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ব্যক্তিবিশ্বাসকে অগ্রাধিকার দিতে ইচ্ছুক তাদের জন্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত একাত্তর। এবং এ একাত্তরেই এ গোত্রভুক্ত লোকদের পূর্বপুরুষেরা এভাবে ধর্মের নাম নিয়ে গণহত্যার জাস্টিফিকেশন তত্ত্ব দিয়েছিল। ইতিহাস বলছে- জাস্টিফিকেশন তত্ত্বওয়ালারা হেরেছিল এবং ভবিষ্যতে তারাই হারতে থাকবে!”
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



