বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কারাগার থেকে বের হওয়া এবং অনেকটা নীরবে দেশত্যাগের বিষয়ে দলের ভেতরে-বাইরে নানা ধরনের আলোচনা ও গুঞ্জন হচ্ছে। চিকিৎসা গ্রাউন্ডে মুক্তি এবং তা খুব সাধারণভাবে না হওয়ায় আলোচনার ডালাপালা ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনেও খটকা লেগেছে। তাছাড়া মুক্তির পরও ২৬ জুলাই চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে-পরে তার মুখে রাজনৈতিক বক্তব্য শোনা যায়নি। যার কারণে গুঞ্জনটা প্রকট হয়।
বিএনপির ভেতরে বলাবলি হচ্ছে, এক ধরনের মুচলেকা দিয়েই মির্জা ফখরুল কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। নইলে তিনি এখনই মুক্তি পেতেন না। কারণ তাকে ঘিরে এক ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা হয়েছিল, যাতে পুরোপুরি রাজি হননি তিনি। তবুও ‘শর্তানুযায়ী’ তাকে নিশ্চুপ থাকতে হচ্ছে!
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘তিনি (ফখরুল) যে অসুস্থ তা আদালতও বলেছে। মুক্তি পেলে তিনি চিকিৎসা করাতে যাবেন তা আগেই নির্ধারিত ছিল। এখন তার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে নানা অপপ্রচার চালানোর উদ্দেশ্যেই হচ্ছে, দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করা। আমি বলতে বাধ্য হব, যারা এগুলো বলছেন, তারা রাজনৈতিক শিষ্টাচার জানেন না।’
গত এক সপ্তাহে বিএনপির অন্তত চার শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং একাধিক মধ্য সারির নেতার সঙ্গে আলাপকালে মির্জা ফখরুলকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের গুঞ্জন সম্পর্কে তাদের মনোভাবও জানা গেছে। বিষয়টি যে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ওয়াকিবহাল তাও স্পষ্ট হয়েছে তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায়। তবে মির্জা ফখরুলকে কেন্দ্র করে এ গুঞ্জন তার মুক্তির আগেই শুরু হয়েছে।
মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা কারাগারে থাকাকালেই দল ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছে দলটি। এখন বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমেও নানা ধরনের খবর বের হচ্ছে। তাই তার মুক্তিকে কেন্দ্র করে সে ধরনের একটি মোটিভ আছে বলে সাধারণের ধারণা।
সোমবার বিসিসি সংলাপে বিএনপি ভাঙার বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। এতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ নিজেদের অবস্থানে থেকে বক্তব্য তুলে ধরেন। এতে বিএনপি ভাঙার বিষয়ে হাফিজ উদ্দিন বলেন, যা রটে তা কিছুটা হলেও বটে। জনমনেও এমন শঙ্কা আছে। দল ভাঙা কাজ শুরু হয়ে গেছে বলেও মনে করেন তিনি।
দলটির নেতাদের কাছে খবর আছে, মির্জা ফখরুল কারাগারে থাকতে বিশেষ অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা তার সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করিয়েছেন। ওই বিশেষ পক্ষটির দেওয়া শর্ত মানলেই তিনি মুক্তি পাবেন এমনও বলা হয়। এ জন্য ফখরুলের পরিবারের এক সদস্যকে দিয়ে তাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা হয়েছিল। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ দলের এক নেতাও কাজে লাগানো হয় ওই প্রক্রিয়ায়।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন এমন এক নেতার সঙ্গে তার বাসায় আলাপকালে তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলামের হাইকোর্টে জামিন, তারপর তার বিরুদ্ধে আপিল এবং এরপর মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে তার মুক্তির বিষয়টি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এটি স্বাভাবিক মুক্তি নয়।
ওই নেতা মনে করেন, মির্জা ফখরুল দলের প্রতি আনুগত্য, অতীতের অন্যদের মতো বেইমানি তিনি করবেন না- এমন বিশ্বাস রয়েছে তার। তবে দীর্ঘদিন তিনি দেশে না এলে ফখরুলের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তার ঘনিষ্ঠরা কেউ বলছেন, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা শেষে তিনি ফিরে আসবেন। কেউ বলছেন, সিঙ্গাপুর চিকিৎসা শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়া যাবেন। সেক্ষেত্রে তার দেশে ফিরতে সময় লাগবে। অস্ট্রেলিয়ায় তার মেয়ে থাকেন।
২০১১ সালের ১৬ মার্চ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর ২০ মার্চ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সৌদি আরব যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে যান। বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্কের মধ্যে খালেদা জিয়া দেশে ফিরলে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন।
দলের বৃহৎ একটি অংশ তার বিরোধী হওয়ায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দৃঢ়তা না থাকাসহ তাকে কেন্দ্র করে নানা সমালোচনার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হয়নি। যদিও দলের একটি অংশ চেয়েছেন তাকে মহাসচিবের দায়িত্ব দিতে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পর কয়েকবার তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল।
৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের আন্দোলন কর্মসূচি শুরুর পরদিনে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে মির্জা ফখরুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৪ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুক্তি পান মির্জা ফখরুল। ওই সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি অসুস্থ। খুব শিগগিরই চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাবেন। ছয় মাসে তার ১২ কেজি ওজন কমেছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
এরপর দিন ১৫ জুলাই তিনি খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবনে গিয়ে দেখা করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা তিনি ছিলেন সেখানে। কিন্তু গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয় কিংবা নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও যাননি।
দলীয় নেতাদের পর্যবেক্ষণ- এই প্রথম কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে মির্জা ফখরুল কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি। এর আগে যতবার কারাগার থেকে বের হয়েছেন, ততবারই মুক্তির পরপর রাজনৈতিক বক্তব্যে সোচ্চার ছিলেন। এ সব হিসাব-নিকাশ ও বিশ্লেষণে মির্জা ফখরুলকে নিয়ে গুঞ্জনটা বেশি ছড়াচ্ছে।
জানতে চাইলে এ ব্যাপারে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান বলেন, মিথ্যা মামলায় মির্জা ফখরুল জেলে ছিলেন এবং সর্বোচ্চ আদালত তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন বিধায় তাকে জামিন দিয়েছেন। এ নিয়ে কোনো ধরনের রাজনীতি করার অবকাশ নেই। আমি দোয়া করি, দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক।
জানা গেছে, কারাগার থাকতেও রাজনীতির প্রতি অনীহার বিষয়ে কথা বলেছিলেন ফখরুল। সম্প্রতি কারাগার থেকে বের হয়েছেন এমন কয়েকজন মধ্য সারির নেতাও বলেছেন, রাজনীতির খায়েশ মিটে গেছে। রাজনীতি করতে চান না ফখরুল- এমন মন্তব্যও কারাগারে থাকতে করেছেন।
দলের এক নীতিনির্ধারক, যিনি পোড় খাওয়া রাজনীতিকও; তিনি বলেন, ফখরুলের সঙ্গে কার কথা হয়েছে, তা জানি না। কিন্তু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাবটাই তাকে ভোগাচ্ছে। এ ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে তিনি আগে পড়েননি। তাই সেটা ঠিকভাবে ‘সামাল’ও দিতে পারেননি। যার কারণে কিছু ‘বিপদে’ই পড়তে হয়েছে তাকে।


