টানা বর্ষণ ও নদ-নদীতে আস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। মঙ্গলবার বৃষ্টিপাত কম থাকায় বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কে সীমিত আকারে যানবাহন চললেও নিুাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা এখনও পানির নিচে। অনেক জেলা ও উপজেলায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে ভারি বর্ষণের পাশাপাশি ভারতীয় ভূখ- থেকে পানি প্রবেশ করায় যশোর সীমান্তের বিস্তৃীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ এলাকায় প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে পানি। এদিকে দক্ষিণের জেলাগুলোতে বন্যাদুর্গত এলাকায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবন্দি এলাকার অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছেনি ত্রাণ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাব। বান্দরবানসহ কিছু এলাকায় সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ করলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। ফলে বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণের জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে পানিবন্দি এলাকায় রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রায়। অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সাতকানিয়ায় আদালত ভবনে পানি প্রবেশ করায় ৩ দিন ধরে বন্ধ বিচার কার্যক্রম। পানিতে ভেসে গেছে লাখ লাখ পুকুর ও মাছের ঘের। বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলের ক্ষেত পানিতে ডুবে থাকায় পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে রাস্তাঘাট। বাড়িঘরে পানি উঠে যাওয়ায় অনেকের রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ। ফলে পানিবন্দি মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বান্দরবান : জেলা সদরের সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়েছে। তবে জেলা সদরের সঙ্গে রাঙ্গামাটি জেলা সদর, রুমা, থানছি, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং রোয়াংছড়ি উপজেলা সদরের মধ্যে ৪ দিন ধরে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এসব জেলা ও উপজেলার সড়কপথগুলোর নানা স্থানে ব্যাপক পাহাড় ধসে পড়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ এবং উপজেলাগুলোর সড়কপথগুলো পুনঃচালু করতে ৫-৭ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সওজ বিভাগের প্রকৌশলীরা। জেলায় মাত্র ১ মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা কমপক্ষে ২০ হাজার বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
জেলা শহরের ৮টি এবং লামা উপজেলা সদরের ৫টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে কমপক্ষে ৩ হাজার বন্যার্ত পরিবার এখনও অবস্থান করছেন। তাদের আরও কমপক্ষে ২ দিন থাকতে হবে আশ্রয় কেন্দ্রে। উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের প্রাথমিক তথ্যমতে, জেলায় প্রায় ৫ হাজার কাঁচা বাড়ি বন্যায় ও পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক হাজার একরের পাহাড়ি ফসল এবং ফলজ-বনজ গাছপালা পাহাড় ধসে নষ্ট হয়েছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। জেলায় ত্রাণ তৎপরতা অপ্রতুলতার কারণে খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে মঙ্গলবার দুপুরে জানিয়েছেন জেলার ৭টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।
ফেনী : টানা ভারি বর্ষণে ফেনী সদর, উপজেলার শশর্দী, পাঁছগাছিয়া, সিন্দরপুর, ধর্মপুর, রাজাপুর, জায়লস্কর ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থতির অবনতি হয়েছে। ভারি বর্ষণ না থাকায় ফুলগাজী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ফুলগাজী বাজার ও গ্রামীণ সড়ক থেকে পানি সরে গেছে। তবে ফেনী-এলাহীগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কটিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা শহরের সঙ্গে সড়ক পথে সব যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
ফেনী সদর উপজেলার শশর্দী, পাঁচগাচিয়া, ধর্মপুর,দাঁগনভূঞার সিন্দুরপুর, রাজাপুর উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের প্রায় ৭০টি গ্রামের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব গ্রামের কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে অনেক পরিবার। বিরলী উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুলে ঘরবাড়ি ছাড়া ৫০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এসব এলাকায় এখনও কোনো সরকারি সাহায্য পৌঁছায়নি।
কক্সবাজার: কক্সবাজারের রামুতে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় পৃথকভাবে মৃত্যু হয়েছে শিশুসহ ৩ জনের। এরা হল- নরুল ইসলাম, শিশু সানম ও ১২ দিনের বয়সের এক নবজাতক। এছাড়া বাঁকখালী নদীতে পড়ে এখনও নিখোঁজ রয়েছে আবছার নামের এক শিশু। এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমায় পানি নামতে শুরু করেছে জেলার বন্যাদুর্গত এলাকাগুলো থেকে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ভাইরাস জ্বর, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় চলছে ত্রাণের জন্য হাহাকার। জেলার চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, সদর, রামু, উখিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
কুমিল্লা: কুমিল্লার লাকসামে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়ে জলাবদ্ধতার ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ডাকাতি নদীর পানি ১৬ সেন্টিমিটার অতিক্রম করে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জলাবদ্ধতার ফলে উপজেলা ও পৌরসভার অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। মাছের বেড়িগুলো তলিয়ে গেছে। সরকারিভাবে এখনও কোনো সাহায্য না এলেও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করতে দেখা গেছে।
সাতকানিয়া : সাতকানিয়া যুগ্ম জজ আদালত, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া সহকারী জজ আদালত ভবন ডুবে থাকায় রোববার থেকে বিচার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। দাগনভূঞা : দাগনভূঞায় ৩০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
যশোর : টানা বর্ষণে যশোর অঞ্চলের চার জেলায় প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমির ফসলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আউশ, আমন বীজতলা, বোনা আমন, রোপা আমন, শাক-সবজি, মরিচ ও ফুলের অধিকাংশ ক্ষেত পানির নিচে। টানা বর্ষায় আউশ ও রোপা আমনের ফসল পানির নিচে।
বেনাপোল : যশোরের বেনাপোলের ধান্যখোলা ও শার্শার গোগা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় উজানের পানির প্রভাবে নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শত শত হেক্টর জমির আমন ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। উপজেলার কোদলা নদী, বেতনা নদী ও ভারতের ইছামতি নদীর সংযোগ খালগুলোতে হাজার হাজার পাটা বাঁধ ও মাটির বাঁধের কারণে কৃষকদের গলায় ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব অবৈধ বাঁধ।
কাউখালী (পিরোজপুর) : কাউখালীতে গত এক সপ্তাহ ধরে ভারি বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ার ফলে জনজীবন বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলার নিুাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এ সমস্ত পানিবন্দি মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে জীবনযাপন করছে। একদিকে ভারি বর্ষণ অন্যদিকে নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে রাস্তাঘাট এবং শহর রক্ষাবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে আমন বীজতলা ও ইরি ধানের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
মনপুরা (ভোলা) : ভোলার মনপুরায় টানা বর্ষণ ও পূর্ণিমার জোয়ারে বেড়িবাঁধহীন চরাঞ্চল ও নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। টানা বর্ষণে মূল ভূ-খ-ে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে উপজেলার ১০ হাজার মানুষ গত ৭ দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে। উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন বেড়িবাঁধহীন কলাতলীরচরে ৭-৮ ফুট জোয়ারের পানিতে ডুবে রয়েছে বলে মুঠোফোনে জানান ইউপি সদস্য জাফর। এছাড়াও বিচ্ছিন্ন ঢালচর, চরনিজাম, শামসুদ্দিন চর, বদনারচরেও একই অবস্থা বলে জানা যায়।
বেগমগঞ্জ (নোয়াখালী) : বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রধাণ বাণিজ্যিক শহর চৌমুহনীর কিছু অংশ এবং উপজেলার অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে বন্যা দেখা দেয়। ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩টি ইউনিয়নই বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার দুর্গাপুর, কুতুবপুর, হাজিপুর, নরোত্তমপুর, বেগমগঞ্জ, আমানউল্যাপুর, শরিফপুর, কাদিরপুর, আলাইয়ারপুর, রাজগঞ্জ, ছয়ানী, গোপালপুর ও হাজীপুর ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সেনবাগ : বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যায় উপজেলার ১১০টি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভেসে গেছে শত শত মৎস্য খামার। ভারি বর্ষণে ছোট ফেনী নদীর প্রবল স্রোতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, স্কুল-মাদ্রাসা পানির ডুবে গেছে। এসব এলাকার ৪/৫ ফুট পানির নিচে গ্রামীণ সড়ক।
ডেস্ক রিপোর্ট
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম


