বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

শেষ সময়েও ভারতীয় ছিটমহলে বাংলাদেশিদের হামলা

sitmahal-ssভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এতোদিন বাংলাদেশের ভেতরের ছিটমহলে থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তারা মৌলিক অধিকার ও নানা নিযাতন সহ্য করে আসছেন। আর কিছু সময় পর ৩১ জুলাই মধ্যরাত বারোটায় তারা হয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু শেষ সময়েও তো নানাভাবে হয়রানি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন। এমনটির প্রমাণ মিলল বৃহস্পতিবার পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার কোট ভাজনী ছিটমহলে গিয়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ওই ছিটমহলের ইছাহাক, মারফত, চাঁন খা, নূর মুহাম্মদ, আব্দুল কাদের, ফুলেরা বেগমসহ ৭-৮টি গরীব পরিবার অন্যের জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছেন। এটি নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলা মির্জাগঞ্জ গ্রাম সংলগ্ন।

ওই গ্রামের সাপিরপাড়া মহল্লার প্রামাণিক, লিটন, সহিদ, মোস্ত মিয়া, বাবুল হোসেন, আলম, আইজুল, বলো, মমিনুর, খোকা, কাচ্চু বাউ, ছফিয়ার, রতন, রুবেলসহ অর্ধশতাধিক বাসিন্দা বৃহস্পতিবার ভোরে লাঠিসোটা নিয়ে ছিটমহলের এ সব গরীব মানুষের ঘরবাড়ি ও জমি দখলে নিতে আসে। বাড়িতে ভাঙচুর, কাঁঠাল পেরে নেওয়া, বিভিন্ন ক্ষেতে হাল চাষ দেওয়া, বেশ কয়েকজন নারীসহ অনেককে মারধর করে হুমকি দেয়। তারা বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে। দুই দিনের মধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে দিতে হুমকি দিয়ে যায়। না হলে হত্যারও হুমকি দেয়। বাড়ির পাশেই লালশাক বুনেছিলেন গরীব পরিবারেরা। দুষ্কৃতকারীরা তা নষ্ট করে বুনে গেছেন পাটবীজ। অসহায়ের মতো ছিটমহলের এ সব বাসিন্দা শুধু অনুনয়-বিনয় ছাড়া কিছুই করার ছিল না। কারণ, তাদের তো বিচার নেই, থানায় মামলা করার অধিকার নেই। তাই চুপ করে থেকে দেখা ছাড়া করার ছিল না কিছু। দুই দিনের মধ্যে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের গাছ থেকে কাঁঠালগুলো পেরে নিয়ে যায় তারা।

ছিটমহলের বাসিন্দা ফুলেরা বেগম জানান, শয়তানলা (শয়তানরা) বাড়িঘর ভাঙ্গিবা আইচ্ছিল। বাধা দিছিনু, মোক গুড়ি দেহেনে ফেলায় দিল, মাইর দিল। হামার বাড়ির লোকজন ভয়তে পালাইছে।

ছিটমহলের বাসিন্দা মারফত জানান, জমিলা ওমার (তাদের) কেহেনে ক্ষেত বাড়িত হালচাষ দিল। ঘরবাড়ি জমি জায়গা ছেড়ে দেহেনে পালাবা কহিল। হামরা (আমরা) ১০ বছর ধরে এই জমিলা ভোগদখল করে খাচি।
ছিটমহলের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানান, ওই দুষ্কৃতকারীরাই কিছুদিন আগে তার ১ একর ১ বিঘা জমি দিনের বেলা দখল করে নেয়।

ছিটমহলবাসী যে কত অসহায় তা বুঝা গেল দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের কথাতেও। তাকে প্রশ্ন করা হয়-কোট ভাজনী গ্রামে বহিরাগতদের হামলা ও হুমকির বিষয়টি জানা আছে কিনা, কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন এ ব্যাপারে।

বিষয়টি জানা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৩১ জুলাই রাতে ছিটমহল বিনিময় হবে। এর আগে কিছুই করার নেই। কারণ তারা তো এখনো আমাদের (বাংলাদেশ) নাগরিক নন। ৩১ জুলাইয়ের পর তারা (ছিটমহলবাসী) যদি অভিযোগ নিয়ে আসে তাহলেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

ভুক্তভোগী ছিটমহলের বাসিন্দাদের কাছে সময়টা যেন শেষই হচ্ছে না। শুক্রবার রাত পোহালেই যেন তাদের সকল যন্ত্রণা ও দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কোট ভাজনী ছিটমহলে গিয়ে দেখা যায় ফাঁকা জায়গায় বসেছে নতুন বাজার। ছিটমহলের বাসিন্দারাই প্রায় দুই মাস আগে এ বাজার বসিয়েছেন। অর্ধশতাধিক টিনের ঘর ও ছাপরা ছাড়াও টংয়ের দোকান। চায়ের দোকানগুলো সরগরম। সেখানেই কথা হয় ইসহাক আলীর সঙ্গে।

চল্লিশোর্ধ্ব ইসহাক বলেন, ‘আমাদের কী যে কষ্ট তা আমরাই জানি। এত বছর পর আল্লাহ আমাদের ফরিয়াদ শুনেছেন। দুই দিন পরেই আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হব। কী যে খুশি লাগছে তা বলতে পারব না।’

চায়ের দোকানে কথা হয় দেবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রির ছাত্র রাহেনুর ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্কুলে ভর্তির সময় জন্ম সনদ লাগে। কিন্তু, সেই সনদ অনেক চেষ্টা তদবির করে চেয়ারম্যানের কাছ থেকে আমার বাবা নিয়ে স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। এভাবে ছিটের অনেকেই লেখাপড়া করলেও চাকরি-বাকরিতে সমস্যা হয়। মিথ্যা পরিচয় দিতে হয়। এখন তো আর তা দিতে হবে না। মনেপ্রাণে তো আমরা বাংলাদেশীই। বাংলাদেশের আলো-বাতাসেই আমাদের বেড়ে ওঠা, চলাফেরা। নাগরিকত্ব না থাকায় কী যে ভোগান্তি আমাদের সহ্য করতে হয়েছে-তা কল্পনাতীত।’

আরও পড়ুন