আখাউড়া থেকে ত্রিপুরার আগরতলা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণকাজ অবশেষে শুরু হচ্ছে। চার বছর অপেক্ষার পর ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ করেছে ভারত সরকার। বাংলাদেশ অংশের জন্যও অনুদান মঞ্জুর করেছে দেশটি। প্রকল্পটির জন্য শিগগিরই প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৮০ কোটি রুপি। এর মধ্যে সাড়ে তিন কিলোমিটার উড়াল রেলপথসহ ভারতের পাঁচ কিলোমিটার অংশের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮০ কোটি রুপি। আর বাংলাদেশ অংশের ১০ কিলোমিটারের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০০ কোটি রুপি (৪৮০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা)। যদিও ২০১১ সালে ১৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৮৬ কোটি রুপি। অর্থাত্ বাস্তবায়ন বিলম্বে প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে ৫৯৪ কোটি রুপি বা ১৫৩ শতাংশ।
প্রকল্পের তথ্যমতে, প্রাথমিকভাবে ভারতের পাঁচ কিলোমিটার অংশটি ভূমিতে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে জনবসতিপূর্ণ এলাকা ও অন্যান্য জটিলতার কারণে বর্তমানে প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ উড়ালপথে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে ভারতের অংশের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণেও ব্যয় বাড়ছে। এদিকে বাংলাদেশ অংশটি প্রাথমিকভাবে মিটার গেজ নির্মাণের কথা থাকলেও তা পরিবর্তন করে ডুয়াল গেজ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। এতে বাংলাদেশ অংশের ব্যয়ও বেড়েছে।
জানা গেছে, আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্ত করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। গত জানুয়ারিতে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। তবে অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) উত্থাপন করা হয়নি।
পিইসি বৈঠকের তথ্যমতে, প্রকল্পটির অর্থায়নে ভারতের সঙ্গে ২০১৩ সালে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হলেও তাতে অনুদানের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না। এছাড়া ভারত সরকার কত টাকা দেবে তা-ও নিশ্চিত নয়। তাই ভারতের অনুদানের বিষয়টি আগে নিশ্চিত হতে বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারিতে ভারতের দূতাবাসের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে চিঠি পাঠালেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে গত জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় আখাউড়া-আগরতলা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আলোচনা হয়। সে সময় প্রকল্পটি অর্থায়নের আশ্বাস দেন নরেন্দ্র মোদি। এর পরই আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি গতি পায়। তবে ভারতের রেল বাজেটে প্রকল্পটির জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল না। ফলে সম্প্রতি প্রকল্পটি অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এক্ষেত্রে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ অংশের জন্য ৪০০ কোটি রুপি অনুদান অনুমোদনের ঘোষণা দেয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ভারতের প্রয়োজনেই আখাউড়া-আগরতলা রেলপথটি বেশি ব্যবহার হবে। তাই ২০১১ সালে প্রকল্পটির অর্থায়নে অনুদানের আশ্বাস দেয় দেশটির সরকার। ২০১৩ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে এমওইউও সই হয়। তবে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় এখন আর অনিশ্চয়তা নেই।
রেলওয়ের তথ্যমতে, আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ নির্মাণে ২০১১ সালে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (ইরকন) সম্ভাব্যতা যাচাই করে। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ অংশে ১০ কিলোমিটার মূল রেলপথ ছাড়াও ৪ দশমিক ২৫ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ করতে হবে। এজন্য ৫৬ দশমিক ৫১ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। প্রকল্পটির আওতায় তিনটি মেজর ও ২০টি মাইনর ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। তিনটি স্টেশনে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সিগনালিং ব্যবস্থাও স্থাপন করা হবে।
জমি অধিগ্রহণ ও রেলপথ নির্মাণসহ প্রকল্পের পুরো ব্যয়ই ভারত সরকার বহন করবে। ভারতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইরকন রেলপথটি নির্মাণ করবে। তবে নির্মাণ তদারকির দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এজন্য রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের বেতন-ভাতা ও প্রকল্পের আওতায় কাস্টম শুল্ক ও ভ্যাট বাংলাদেশ সরকারের তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে। এতে ৫৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক বলেন, ৪০০ কোটি রুপি অনুদানের বিষয়টি এরই মধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার পরই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেকে পাঠানো হবে। এর পরই জমি অধিগ্রহণ শুরু করা হবে। ২০১৭ সালের মধ্যে রেলপথটি নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত সরকার বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ত্রিপুরার দূরত্ব কমাতে চায়। ত্রিপুরা থেকে এখন শিলিগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গে যাতায়াত করতে হয়। এতে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে কলকাতার দূরত্ব দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার। কিন্তু বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সংযোগ প্রতিষ্ঠা হলে এ দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটারে নেমে আসবে। এছাড়া উপকূলীয় নৌযান চলাচল চুক্তি বাস্তবায়ন ও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে রেলপথটি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ পথের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, আখাউড়া-আগরতলা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রেল সংযোগ স্থাপনকারী ষষ্ঠ রুট। বর্তমানে বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে, রোহানপুর-সিঙ্গাবাদ রুটে দুই দেশের মধ্যে রেল চালু আছে। বিরল-রাধিকাপুর সংযোগ স্থাপন কাজ চলছে। আর শাহবাজপুর-মহিষাশন রেল সংযোগ স্থাপন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে, যা শিগগিরই কাজ শুরু হবে। এছাড়া চিলাহাটি-হলিদাবাড়ী ও ফেনী-বেলুনিয়া রুট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে


