বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ভারতীয় ছিটমহলগুলোতেও আনন্দের জোয়ার

WB-Sitmahalভারতের ভেতরে এতেদিন কাগজে কলমে বাংলাদেশের হয়ে থাকা ৫১টি ছিটমহল এখন ভারতের সঙ্গে জুড়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছে সেখানে আনন্দের জোয়ার।

৬৮ বছরের পরাধীনতার গ্লানি কাটিয়ে মধ্যমশালডাঙা ছিটমহলের বাসিন্দারা এইমাত্র ভারতের নাগরিক হলেন। শুধু তারাই নন, দু’পারে ছিটমহলগুলো মিশে গেল ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে।

এই ঐতিহাসিক ক্ষণের সাক্ষী দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি আর হাজার হাজার নয়া ভারতবাসী।

কলকাতা থেকে ৭২৫ কিলোমিটার দূরে কোচবিহার জেলার দিনহাটা মহকুমারের মধ্যমশালডাঙায় শুক্রবার মধ্যরাত থেকে আনন্দের জোয়ার বইছে।

প্রবীণ নাগরিকরা জ্বালালেন ৬৮টি মোমবাতি। জ্বলে উঠল আলোকমালা। কিছুক্ষণের পিনপতন নীরবতার পরই এই ঐতিহাসিক ক্ষণটিতে হঠাৎই বিশাল উল্লাস আর শ্লোগানে কান পাতা দায়।

মঞ্চে উপস্থিত ছিটমহল আন্দোলনের জনক প্রয়াত দীপক সেনগুপ্তের স্ত্রী সুনন্দা সেনগুপ্ত, ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির শীর্ষ নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্ত, বাংলাদেশ থেকে আসা আইনজীবী আব্রাহাম লিংকন, বিনিময় কমিটির আইনি উপদেষ্টা আহসান হাবিব, ছিটমহলের প্রবীণ বাসিন্দা আজগর আলী, মনসুর আলী, স্থানীয় বিধায়ক ও তৃণমূল নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষ প্রমুখ।

মাইকে বেজে উঠল-জনগণ মন অধিনায়ক জয় হে … তেরঙা পতাকা উঠল নয়া ভূখণ্ডের মাটিতে। আবার তা নামিয়ে অর্ধনমিত করা হলো প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের স্মৃতিতে। অর্ধনমিত পতাকাকে সাক্ষী রেখে এভাবেই বাংলাদেশি ছিটমহলের ১৪ হাজার ৮৫৬ জন বাসিন্দা ভারতীয় নাগরিক হওয়ার শপথ নিলেন। অনেকের চোখেই তখন জল, স্বাধীনতার স্বপ্ন সার্থক হওয়ার আনন্দাশ্রু।

এর আগে সকাল থেকেই ভারতের অভ্যন্তরে ৫১টি ছিটমহলে ছিল উৎসবের মেজাজ। করলা, জোংরা, ফলনা, পোয়াতুরকুঠি, মশালডাঙা, বাত্রিগাছ, শিবপ্রসাদ মুস্তাফিসহ প্রতিটি ছিটের বাসিন্দারা এই দিনটির জন্যই অপেক্ষা করেছিলেন এতদিন। অনেক পরিবারের ছেলেমেয়েরা নতুন জামা পরেছে। যেন ঈদ, দুর্গাপূজার মতো এক উৎসব যুক্ত হলো তাদের জীবনে। এদিন জুমার নামাজ শেষে প্রতিটি ছিটেই বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা। শিবপ্রসাদ মুস্তাফি ছিটমহলের শতাব্দীপ্রাচীন শিবমন্দিরে আয়োজন করা হয় পূজার। কলকাতা থেকে সংবাদমাধ্যমের ওবি ভ্যানগুলো এদিন মাটির সড়ক দিয়ে চলে এসেছে ছিটমহলে। সত্যিকার অর্থেই এদিন নাগরিকত্ববিহীন মানুষগুলো হয়ে উঠেছে ভিভিআইপি।

মুক্তির সূর্য দেখতে চাই : এ দিনটিরই অপেক্ষা করে আছেন তিনি বছরের পর বছর ধরে। ৫১টি ছিটমহলে বয়োজ্যেষ্ঠ তিনিই। কোচবিহারের দিনহাটার বাংলাদেশি ছিটমহল মধ্য মশালডাঙার বাসিন্দা আজগর আলীর বয়স এখন ১০৬। ক্ষীণ হয়ে এসেছে চোখের দৃষ্টি। তাই সারাজীবন ধরে পুষে রাখা স্বপ্নপূরণের শেষ ধাপে এসে এখন আর যেন তর সইছে না। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ঘুম আসে না আর। আর ঘুমাতেও চাই না অন্ততপক্ষে ১ আগস্ট ভোর পর্যন্ত। এই ছিটমহলে মুক্তির সূর্য দেখতে চাই। এর জন্যই তো বেঁচে আছি। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। প্রতিদিন তার কাছে প্রার্থনা করতাম। মুক্তি না মেলা পর্যন্ত যেন আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন তিনি।

মঞ্চে নানা আয়োজন : সাদ্দাম, জয়নাল, বিষ্ণুরা আজ খুব ব্যস্ত। কথা বলার সময় নেই তাদের। মশালডাঙায় কেন্দ্রীয় উৎসবের মঞ্চ সাজানো থেকে আগত অতিথিরা কে কোথায় থাকবেন তার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এরই মধ্যে ভারতীয় ভূখণ্ডের নাজিরহাটের পাকা সড়ক থেকে মূল মঞ্চ পর্যন্ত মাটি ফেলে সড়ক নির্মাণ করেছেন ছিটমহলবাসী। বেলুন দিয়ে বানানো হয়েছে তোরণ। সড়কের দু’ধারে ভারতের পতাকা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে। রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর ইন্দিরা গান্ধীর ছবি। মূল মঞ্চটি করা হয়েছে প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামকে শ্রদ্ধা জানিয়ে।

যেখানে রয়েছে ছিটমহল আন্দোলনের জনক দীপক সেনগুপ্তের প্রতিকৃতি। ঠিক রাত ৮টায় শুরু হয় মঞ্চের অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে ছিটমহলবাসীর এতদিনের মানবেতর জীবন নিয়ে একটি আলেখ্য পরিবেশিত হলো। মঞ্চে হাজির করা হলো ছোট্ট শিশু জেহাদের ভারতীয় হয়ে ওঠার লড়াই। তুলে ধরা হলো ভারতীয় জেলে বন্দি ছিটমহলবাসীর যন্ত্রণা, ফেসবুক আর সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা। ৯টা ৫০ মিনিটে একটি প্রামাণ্যচিত্র ছিটমহল নিয়ে প্রদর্শিত হয়েছে।

আরও পড়ুন