বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

পিনাক ৬ ডুবির ঘটনায় এখনো নিখোঁজ ৬১ যাত্রী

pinakএম এল পিনাক-৬ লঞ্চডুবির এক বছর পূর্ণ হলো আজ ৪ আগস্ট। এক বছর আগে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া লঞ্চঘাটের অদূরে পদ্মা নদীতে পিনাক-৬ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৪৯টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ৬১ জন ছিলেন নিখোঁজের তালিকায়। কিন্তু এক বছর পার হয়ে গেলেও এখনো ৬১ জন ‘নিখোঁজ’ই থেকে গেলেন। এদের মারা যাওয়া সংক্রান্ত এখনো কোন ‘মৃত্যু সনদ’ দেয়া হয়নি। লাশ মেলেনি বলে নিখোঁজদের পরিবার সরকারের কাছ থেকে কোন ক্ষতিপূরণ পায়নি।

লঞ্চ ডুবির ঘটনায় মামলা হলেও তা সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রমেই থমকে আছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগ, কেউ সাক্ষ্য দিতে না আসায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ অধিকাংশ সাক্ষীর বাড়ি অন্য জেলায়। এ কারণে মামলারও অগ্রগতি নেই। মামলায় গ্রেফতার লঞ্চের মালিক আবু বক্কর সিদ্দিক কালু ও তার  ছেলে ওমর ফারুক লিমন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অন্য আসামিরা আজো গ্রেফতার হয়নি। দুর্ঘটনা রোধে তদন্ত কমিটির ২৫ সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি।

এ ঘটনায় লঞ্চের মালিক আবু বকর সিদ্দিক, সারেং ও সুকানিসহ ছয়জনকে আসামি করে পরদিন লৌহজং থানায় হত্যা মামলা করেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বি আইডব্লিউটিএ) মাওয়া নৌবন্দরের পরিবহন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া। ঘটনার পরই জাহাঙ্গীর ভূঁইয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে তদন্তে ওই লঞ্চডুবির ঘটনায় জাহাঙ্গীরের কোনো গাফিলতি খুঁজে পায়নি বি আইডব্লিউটিএ। জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া বর্তমানে সহকারী সমন্বয়কারী কর্মকর্তা হিসেবে বি আইডব্লিউটিএতে কর্মরত আছেন।

নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘লাশ উদ্ধার না হওয়ার কারণে আমরা কখনোই একজনকে ‘মৃত’ বলতে পারি না। ‘নিখোঁজ’ নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছে। তবে আমরা ‘মৃত’ ঘোষণাও দিতে পারব না। আইনি এই বাধার কারণেই সরকারের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও তাদের আর্থিক সহায়তা দেয়া যায়নি।

পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবির মাত্র দুদিন আগে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার রূপার বিয়ে হয়েছিল মিজানুর রহমানের সাথে। লঞ্চ ডুবিতে মিজানুর রহমানের নামটি নিখোঁজের তালিকায় স্থান  পেয়েছে। সোমবার রূপার বাবা শাহ আলম বললেন, মেয়েটা দুদিনে বিধবা হয়েছে। স্বামীর কবরটাও দিতে পারেনি। এখন তাদের কেউ খবর রাখে না।

একই আক্ষেপ নিয়েই গাজীপুরের রিনা বেগম সারাজীবন ছেলে ইমতিয়াজের পথ চেয়ে থাকবেন। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার বড়দিয়া বামনডাঙ্গা গ্রামের মাহমুদা বেগম প্রতিবছর ভাববেন, তিন বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়া ভাগ্নে হানিফ কতটা বড় হচ্ছে? মাদারিপুরের ডাসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী সবুজের পরিবারের চার সদস্য ছিলেন পিনাক-৬ লঞ্চে। মা মেহেরুন্নেসা ও শ্যালক সেনা সদস্য আল-আমীনের লাশ পাওয়া গেলেও আজো নিখোঁজ স্ত্রী ময়না আক্তার ও ছেলে তৌফিক কাজী।

তিনি বলেন, লাশ পেলে অন্তত মনটাকে শান্ত করতে পারতাম। ছেলের করবটা জিয়ারত করতে পারতাম।  কাজী সবুজ জানান, আল-আমীনের পরিবারকে মাত্র ৩০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। অন্য কোন অনুদান-সহযোগিতা না পাওয়ায় তার পরিবার অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রথমে তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন লৌহজং থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হায়দার আলী। তাঁর কর্মস্থল পরিবর্তন হওয়ায় এখন তদন্ত করছেন এসআই মো. আবু জাফর।

এসআই জাফর আলী খান বলেন, এটি একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলা। মামলার তদন্তে প্রায় ৩০ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। কোন আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এ মামলার তদন্তে সরকারের পক্ষ থেকে একটি দিক-নির্দেশনা আসা প্রয়োজন। ঐ দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলবে। আবু জাফর বলেন, ‘সাক্ষীদের বাড়ি অন্য জেলায় হওয়ায় অনেকে সাক্ষ্য দিতে আসতে চান না। তবে আমাদেরও চেষ্টার কমতি নেই।’

বিশেষ প্রতিবেদক,ঢাকা

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম

আরও পড়ুন