চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে জেলার দক্ষিণাংশের দূরত্ব কমাতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণ করা হবে টানেল। এজন্য গত ৩০ জুন চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিসিসিসি) সঙ্গে চুক্তি করে সেতু বিভাগ। এর আওতায় প্রকল্পটির নির্মাণকাজ-সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় কেনা হবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার। এতে ব্যয় করা হচ্ছে প্রায় ২৭ কোটি টাকা, যা পদ্মা সেতুর জন্য কেনা সফটওয়্যারের দামের ১২ গুণ।
কর্ণফুলী টানেলের আওতায় গাড়ির জন্যও অস্বাভাবিক ব্যয় হবে। ১২টি গাড়ি কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। আর সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে ৬ কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। সার্ভিস এরিয়া ভাড়ায়ও ব্যয় বেড়েছে ৭ গুণের বেশি।
চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণে (বায়ার্স ক্রেডিট) নির্মাণ করা হবে কর্ণফুলী টানেল। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। চুক্তির আওতায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার সরবরাহ করবে সিসিসিসি। তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এটি সরবরাহ করা হবে। এতে ব্যয় হবে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা ২৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
আর পদ্মা সেতুর জন্য সম্প্রতি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কেনা হয় দক্ষিণ কোরিয়ার মাইডাস ইঞ্জিনিয়ারিং সফটওয়্যার কোম্পানির কাছ থেকে। এতে ব্যয় হয় ২ লাখ ৭৮ হাজার ডলার বা ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী পদ্মা সেতুর নির্মাণ তদারকি প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে সফটওয়্যারটি সংগ্রহ করা হয়। ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয় পদ্মা সেতু প্রকল্পটিও বাস্তবায়ন করছে সেতু কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটির বাস্তবায়নাধীন অন্য প্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্যও একটি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কেনা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে কেনা সফটওয়্যারটির দাম মাত্র আড়াই লাখ টাকা। দেশীয় প্রতিষ্ঠান সাবিনকো সফটওয়্যার লিমিটেড থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়। এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা।
যোগাযোগ করা হলে সাবিনকো সফটওয়্যারের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, এক্সপ্রেসওয়ের জন্য সরবরাহ করা সফটওয়্যারটি মূলত সাধারণ অফিস ব্যবস্থাপনা-সম্পর্কিত। আর পদ্মা সেতুর জন্য কেনা সফটওয়্যারটি প্রকল্পের প্রকৌশলগত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক। তাই দামে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে টানেলের জন্য কেনা সফটওয়্যারটির দাম এত বেশি হওয়ার বাস্তবিক কোনো কারণ আছে কিনা জানা নেই।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প পরিচালক ও সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, টানেল নির্মাণে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা নেই। তাই প্রকল্প ব্যয় চূড়ান্ত করার আগে এক্সপার্ট বিদেশী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মতামত নেয়া হয়েছে। সবার মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
যদিও প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার সরবরাহের কোনো প্রস্তাবও করা হয়নি বলে জানান কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্ত করা হয় গত ডিসেম্বরে। তাতে ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কেনার বিষয়টি ছিল না। গত মার্চে টানেল নির্মাণে আর্থিক প্রস্তাব দেয় সিসিসিসি। তাতেও সফটওয়্যার কেনার প্রস্তাব ছিল না। তবে গত জুনে প্রকল্প ব্যয় চূড়ান্ত করার সময় সফটওয়্যার ও টাগবোট কেনা এবং নির্মাণকালীন সার্ভিস এরিয়ার ভাড়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রকল্পটির চুক্তিপত্রে দেখা গেছে, চীনের প্রস্তাবনায় ১২টি অংশে ব্যয় বিশ্লেষণ করা ছিল। এর বাইরে পরিশিষ্ট অংশে অতিরিক্ত ৫ কোটি ৯৮ লাখ ডলার ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ৪ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার সার্ভিস এরিয়া ভাড়া, ৯২ লাখ ডলারে টাগবোট ও ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কেনা। এ ব্যয় পুরোটাই বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় বহন করা হবে।
প্রকল্পটির সার্ভিস এরিয়া ভাড়াও অস্বাভাবিক মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সম্ভাব্যতা যাচাইকালে এ খাতে ব্যয় ধরা হয় মাত্র ৫০ কোটি টাকা। অথচ চুক্তির আওতায় নির্মাণ এলাকা ভাড়া বাবদ ৩৬৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা (৪ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার) ব্যয় ধরা হয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় প্রকল্পটির আওতায় সাতটি গাড়ি ও ২২টি মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়। এ খাতে ব্যয় ধরা ছিল ৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। আর রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। তবে গত জুনে সই করা চুক্তিতে ১২টি গাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে আড়াই হাজার সিসির ছয়টি জিপ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা, তিন হাজার সিসির তিনটি জিপ কেনায় ৩ কোটি ১৯ লাখ ও তিনটি মাইক্রোবাস কেনায় ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আর গাড়িগুলো রক্ষণাবেক্ষণে ৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণেও চীনের কঠিন শর্তের ঋণ নেয়া হচ্ছে।
এর বাইরে প্রকল্প অফিস নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, চালকদের বেতন ও গাড়ি রাখার শেড নির্মাণ, বিনোদন বাবদ ব্যয়, গৃহকর্মীদের বেতন, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ক্রয়, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ বিলসহ সব ধরনের ব্যয় চীনের বায়ার্স ক্রেডিটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এসব ব্যয়ের অর্থ সরকারকে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে শুধু জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন ব্যয় বাদে সবকিছুই চীনের ঋণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও এখনো ঋণচুক্তি হয়নি। এমনকি ঋণের সুদের হার কত হবে, তা-ও নির্ধারণ হয়নি। তবে চীন সাধারণত কঠিন শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে। তাই যথেচ্ছভাবে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি সরকারের বোঝাই বাড়াবে।
উল্লেখ্য, প্রকল্প ব্যয় নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। গত মে মাসে বৈঠকের পর প্রকল্পটি সেতু বিভাগে ফেরত পাঠানো হয়। বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার সুপারিশ করা হলেও এর পর নির্মাণ ব্যয় কমেনি, উল্টো বেড়েছে। বণিক বার্তা


