বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ক্রেতা ছদ্মবেশে দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় সনদের কারিগর আটক

Neilkhet--সকাল ১১টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস থেকে বের হয় এক যুবক। দেখা গেল সেখান থেকে নীলক্ষেত এলাকায় গিয়ে সে কথা বলছে ‘মায়ের দোয়া উদয়ন প্রির্ন্টাস’-এর মালিক আজগরের সাথে। যুবকের প্রয়োজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের জাল সনদ ও নম্বরপত্র। তিন হাজার টাকার বিনিময়ে এসব জাল দলিল তৈরি করে দিতে রাজি হন তিনি।

বেলা ২টার দিকে এসে কাঙ্ক্ষিত সনদ ও নম্বরপত্র নিয়ে যেতে ওই যুবককে সময় দেন আজগর। এরপর নীলক্ষেত থেকে আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে ফিরে আসেন ওই যুবক।

যে যুবকের কথা বলা হচ্ছে তিনি এনটিভি অনলাইনের বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা। মঙ্গলবার এনটিভি অনলাইনে ‘নীলক্ষেতে মিলছে বুয়েট ঢাবির আসল সনদ’ নামের একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই সংবাদ প্রকাশের পর ঢাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম এ আমজাদ আলী এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রমাণ পেলে এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। সে সময় এনটিভি অনলাইনের বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতার সহযোগিতা চান তিনি।

পরে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের সঙ্গে আলাপ করে পরিকল্পনা করে ক্রেতা সেজে এসব জাল সনদ তৈরির হোতা ও কারিগরদের ধরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। পরিকল্পনার কথা জানানো হয় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়িকেও। এরই অংশ হিসেবে আজ নীলক্ষেতে আজগর মিয়ার প্রতিষ্ঠানে যান ওই সংবাদদাতা।

এরপর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে নীলক্ষেতের মায়ের দোয়া উদয়ন প্রির্ন্টাসের দিকে যান এ সংবাদদাতা। সে সময় একটু পেছন থেকে তাঁকে অনুসরণ করেন পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শকসহ সাদা পোশাকের চার পুলিশ সদস্য। পুলিশ সদস্যদের অনুসরণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ও দুজন সহকারী প্রক্টর।

প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে আজগরকে পাওয়া যায়নি। ফোন করা হয় আজগরকে। আজগর আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলেন। এই সময় আশপাশের দোকানে ক্রেতা সেজে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন পুলিশ ও প্রক্টররা।

আজগর আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানটিতে যান এনটিভি অনলাইনের ওই সংবাদদাতা। ইশারা পেয়ে পুলিশও দোকানটিতে প্রবেশ করে। সেখানে জাল সনদ ও নম্বরপত্রসহ আজগর ও ওই সংবাদদাতাকে আটকের অভিনয় করে পুলিশ। এ সময় সেখানে কাজ করতে আসা আবদুস সালাম নামের আরো এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। সেখান থেকে তাদের প্রথমে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়িতে ও পরে নিউমার্কেট থানায় নেওয়া হয়।

এদিকে ‘মায়ের দোয়া উদয়ন প্রির্ন্টাস’ তল্লাশি করে সনদ জাল করার বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে তৈরি করা জাল সদন, নম্বরপত্র, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সনদ ও নম্বরপত্র, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির নম্বরপত্র, ভারতের ব্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো বিদেশি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নম্বরপত্র জাল করার সরঞ্জাম। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বিভিন্ন ধরনের সনদ, নকল করার ১৪টি ছোট ও ৬৩টি বড় প্লেটসহ বেশ কিছু সরঞ্জামও জব্দ করা হয়।

এ সময় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা জানায়, এসব কাজে তাদের সহযোগিতা করে আরো কয়েকটি দোকানসহ মোট ১৪ জন। এ ছাড়া বাকুশাহ মার্কেটের এক নম্বর গলির ফিরোজের দোকানসহ কয়েকটি দোকানও এসব কাজে জড়িত বলে তাঁরা জানান।

জব্দ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সনদটি হুবহু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল সনদের মতো। এমনকি সনদের ভেতরে জলছাপে দেওয়া ছাগলের ছবিও এসব সনদে রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের জন্য যে ধরনের কাগজ ব্যবহার করা হয় এই জাল সনদেও সে ধরনের কাগজই ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও পুলিশ ধারণা করছে- এসব কাগজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে সংগ্রহ করেন তাঁরা। তা না হলে এই কাগজ বাজারে পাওয়া অসম্ভব।

এ ব্যাপারে আমজাদ আলী বলেন, ‘আটককৃতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে নিউমার্কেট থানায় মামলা করা হবে। এসবের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ জড়িত কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন