বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্ত্রী হিসেবে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কিভাবে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও প্রেরণা দিয়ে কীভাবে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছিল তা সবার সামনে মেলে ধরলেন তাদের মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শনিবার ৮ আগস্ট রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৫তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মায়ের স্মৃতিচারণ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট একদল সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধু ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্য। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় রক্ষা পান।
মাকে হারানোর ৪০ বছর পর জন্মবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, “আমি শুধু সন্তান না, আমি বন্ধুর মতন ছিলাম।
“একটা দেশকে স্বাধীন করা, একটা জাতিকে স্বাধীন করা একদিনে হয় না। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে হয়। সেই ত্যাগ স্বীকার করেছেন আমার মা। জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া তার ছিল না। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন-যাপন করতেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হোক সেটাই তিনি চেয়েছিলেন।”
শেখ হাসিনা বলেন, “তার যে ত্যাগ-তিতিক্ষা, প্রেরণা সেটাই তো বঙ্গবন্ধুকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছিল, যার জন্য আজ আমরা স্বাধীনতা পেয়োছি।”
শিশু বয়সে বাবা-মা হারিয়েছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা। এরপর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তেমন সুযোগ না পেলেও ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ছিল বলে জানান তার মেয়ে শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুব প্রিয় দার্শনিক ছিলেন বার্টান্ড রাসেল। বঙ্গবন্ধু রাসেলের লেখা পড়ে তা অনুবাদ করে ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে শোনাতেন। পরে বার্টান্ড রাসেলের প্রতি ভালোলাগা থেকেই তারা ছোট ছেলের নাম রাখেন রাসেল।
পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রায়ই জেলে যেতে হত বঙ্গবন্ধুকে। তখন পরিবার সামলানোর পাশাপাশি দলের নেতা-কর্মীদেরও যে মায়ের সামলাতে হত, তা উঠে আসে শেখ হাসিনার কথায়।
তিনি বলেন, দল ও পরিবারের প্রয়োজনের অনেক সময় নিজের গহনা ও আসবাবপত্রও তার মাকে বিক্রি করে দিতে হত।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দিনও তার মা খুনিদের কাছে জীবন বাঁচানোর কোনো মিনতি করেননি বলে জানান শেখ হাসিনা। “তিনি কখনও ফার্স্ট লেডি হওয়ার কথা চিন্তা করেননি। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর সফরের সময় ছাড়া তাকে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও দেখা যায়নি। পরিবারের যারা সেদিন জীবন দিয়েছিলেন কেউ কিন্তু ঘাতকদের হাতে জীবন-ভিক্ষা চাননি। বরং মাথা উচু করে জীবন দিয়ে গেছেন। বাঙালি জাতির মর্যাদা রেখে গেছেন।”
অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
তাকে ‘কুসুমিত ইস্পাত’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তিনি নরম মনের মানুষ হলেও মনোবল ছিল কঠিন। তিনি শুধু বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনীই ছিলেন না। তিনি ছিলেন সহযোদ্ধা ও কর্মসঙ্গিনী।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেও বেগম ফজিলাতুন্নেছার অবদানের কথা তুলে ধরেন শামসুজ্জামান খান।
“আমি প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) কাছে শুনেছি, আগের দিন যে ভাষণ প্রস্তুত করা হয়েছিল তা তিনি পড়েননি। কারণ, বঙ্গমাতা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন-কে কী বলেছে শোনার দরকার নেই, তোমার মনে যা আসবে তাই বলবে।”
আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলাতে দলের অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি নেওয়ার কথা বললেও তাতে বেগম ফজিলাতুন্নেছার বিরোধিতার কথাও বলেন শামসুজ্জামান খান।
এসব ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “সেদিন বঙ্গবন্ধু যদি প্যারোলে মুক্তি নিতেনই, তাহলে আজ ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা হত।”
একজন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হয়েও তার সাদাসিধে জীবনযাপনের কথাও তুলে ধরেন শামসুজ্জামান খান।


