বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জঙ্গি ডনকে টাকা দিয়েছেন ব্যারিস্টার শাকিলা

Barrister-Farjanaজঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের শীর্ষ নেতা মনিরুজ্জামান মাসুদ ওরফে ডনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নগদ টাকা জমা দেয়ার কথা র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন গ্রেপ্তার হওয়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। তবে রিমান্ডে থাকা শাকিলার দাবি, জঙ্গি অর্থায়নের জন্য তা দেয়া হয়নি।

রিমান্ড মঞ্জুরের পর বুধবার রাতেই শাকিলাসহ তিন আইনজীবীকে নিজেদের হেফাজতে নেয় র‌্যাব। জঙ্গি অর্থায়নের বিষয়ে একাধিক টিম তাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদ এখনও অব্যাহত আছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‌্যাবের চট্টগ্রাম জোনের পরিচালক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, নগদে টাকা জমা দেয়ার বিষয়ে সব তথ‌্যপ্রমাণ আমাদের কাছে আছে। শাকিলা ফারজানা বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাকে কারা টাকা দিয়েছে, তাদের দেয়া টাকা কোন কোন খাতে খরচ হত, এর সঙ্গে আরও কারা আছে সেসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমে টাকা দেয়ার বিষয়টি শাকিলাসহ তিন আইনজীবীই অস্বীকার করেন। পরে র‌্যাব কর্মকর্তারা প্রমাণপত্র উপস্থাপন করলে তিনি স্বীকার করে নেন। তবে জিজ্ঞাসাবাদে শাকিলা দাবি করেছেন, তিনি আইনজীবী হিসেবে হেফাজতে ইসলাম এবং শহীদ হামজা ব্রিগেডের মামলা পরিচালনা করেন। মামলা পরিচালনার জন্য টাকাপয়সা লেনদেন হয়েছিল।

এ বিষয়ে মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, শাকিলা কখনোই হামজা ব্রিগেডের মামলা পরিচালনা করেননি। অনেক আগে হেফাজতের মামলা পরিচালনা করতেন।

১৮ আগস্ট রাতে ঢাকার ধানমন্ডি থেকে তিন আইনজীবীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরা হলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা (৩৯)। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য পদেও আছেন তিনি।

অপর দু’জন হলেন অ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটন (৩০) এবং অ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন (২৫)।

এদের মধ্যে শাকিলা ফারজানা ও হাসানুজ্জামান লিটন সুপ্রিম কোর্টে এবং মাহফুজ চৌধুরী বাপন ঢাকা জজ কোর্টে আইন পেশায় যুক্ত আছেন।

র‌্যাবের দাবি, তিন আইনজীবী চার ধাপে মনিরুজ্জামান ডনসহ কয়েকজনের অ্যাকাউন্টে নগদে এক কোটি আট লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা দিয়েছেন ৫২ লাখ টাকা। তিনি প্রথম ধাপে ২৫ লাখ ও পরবর্তী ধাপে ২৭ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। হাসানুজ্জামান লিটন ৩১ লাখ টাকা এবং বাপন দিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা।

শাকিলার আইনজীবী সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট ‍আব্দুস সাত্তারের দাবি, মনিরুজ্জামান মাসুদ ওরফে ডন হেফাজতে ইসলামের মামলা পরিচালনার বিষয়ে আসামিপক্ষের হয়ে শাকিলা ফারজানার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। মামলা পরিচালনার জন্য তিনি শাকিলাকে কিছু টাকা দিয়েছিলেন। পরে শাকিলা আবার ওই টাকা ডনের অ্যাকাউন্টে ফেরত দিয়েছিলেন। ফেরত দেয়া টাকাকেই র‌্যাব জঙ্গি অর্থায়ন হিসেবে ধরে নিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, মামলা পরিচালনার জন্য বিশাল অংকের টাকা নগদে লেনদেন হবে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেছে, এটা সন্দেহজনক লেনদেন। তারাও এ বিষয়ে অনুসন্ধান করবে।

ডাচ-বাংলা ব্যাংকে লেনদেন:
নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডকে ডাচ বাংলা ব্যাংকের একাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করেছেন র‌্যাবের হাতে আটক ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাসহ তিন আইনজীবী। রিমান্ডের প্রথম দিনে র‍্যাব জানতে পেরেছে, কোন এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ পেয়েছেন শাকিলা। এখন সেই বড় ভাইয়ের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। আর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন,ফায়দা হাসিলের জন্য কোন রাজনৈতিক দল এই জঙ্গী সংগঠনকে অর্থায়ন করেছে কি না- সেটাও খুঁজে দেখা দরকার।

সুপ্রীমকোট আইনজীবি সমিতির ৪র্থ তলার ৪১১ নম্বর কক্ষে বসতেন শাকিলা ফারজানা। জাতীয়তাবাদি আইনজীবী ফোরামের পদধারী নেতা হলেও মামলার দিন ছাড়া হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে দেখা যেতো না তাকে। জঙ্গী সংগঠনকে অর্থায়নের অভিযোগে শাকিলাসহ আরো দুই আইনজীবী গ্রেফতারের ঘটনায় হতবাক তাদের সহকর্মীরা।

র‍্যাবের তদন্তে ডাচ বাংলার‍ ব্যাংকের পাঁচটি একাউন্টের মাধ্যমে মোট এক কোটি ৩৮ লাখ টাকা লেনদেনের প্রমাণ মেলে। এর মধ্যে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, হাসানুজ্জামান লিটন ও মাহফুজ চৌধুরী বাপনের কাছ থেকে শহীদ হামজা ব্রিগেডের ফান্ডে গেছে এক কোটি আট লাখ টাকা। জানা গেছে, শাকিলার টাকার উৎস তার এক বড়ো ভা্ই। একই সঙ্গে হামজা ব্রিগেডের আরেক অর্থদাতা দুবাইর নাগরিক আল্লামা লিবাদির ব্যাপারে তথ্য জড়ো করছে র‍্যাব।

চারদিনের রিমান্ডের প্রথম দিনে টাকার উৎস এবং অর্থায়নে আরো কারা জড়িত এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে তদন্তকারী সংস্থা। জঙ্গীবাদে আইন পেশাধারীদের জড়িত  হওয়া এবং অর্থায়নের বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও। তারা বলছেন, দেশে প্রথমবার আলোচনায় আসা এ ঘটনা প্রমান করাও তদন্তকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে জঙ্গীবাদ দমনে অর্থায়ন বন্ধ করার এ ঘটনা উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন