মোবাইল চুরির দায়ে পিটিয়ে কিশোর হত্যার অভিযুক্ত ঢাকার হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আরজু মিয়ার র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার ঘটনাকে বন্দুকযুদ্ধ মানতে নারাজ ওই এলাকার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেছেন, বন্দুকযুদ্ধ নয়, আরজুকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে র্যাব।
শুধু তাপসই নয়, আরজু মিয়ার মৃত্যুকে মানতে পারছেন না স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা।
গত মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট ভোর সাড়ে চারটার দিকে র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান আরজু মিয়া (২৮)। গত সোমবার রাজা মিয়া (১৬) নামের এক কিশোরকে চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে আরজু ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে। রাজা মিয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি ছিলেন আরজু মিয়া।
বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে হাজারীবাগের আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে আরজুকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা এ ‘হত্যা’র সঙ্গে জড়িত র্যাব সদস্যদের শাস্তি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আরজুর কয়েকজন স্বজন, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ হাজারীবাগ থানা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের প্রায় ১০০ নেতা-কর্মী। লিখিত বক্তব্য পড়েন থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক হামিদ ওরফে সাজু।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আরজু মিয়া কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডিও নেই। আর এলাকার স্বীকৃত মাদকসেবী রাজা মিয়াকে চুরির অভিযোগে স্থানীয় মানুষ মারপিট করলে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরজুকে ফাঁসানো হয়েছে। এতে র্যাবের পাশাপাশি সরকারেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরজুর ভাই মাসুদ রানা বলেন, আরজু নিহত হওয়ার পর থেকে পরিবারের সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘মা আমারে বলছে, তুই কোনো মামলা-মোকদ্দমা করবি না। আমার এক ছেলেরে ক্রসে দিছে। ও রাজনীতি করত, আর তুই তো সাধারণ মানুষ। তোরে যে ক্রসে দেবে না, তার কী গ্যারান্টি?’
বুধবার দুপুরে হাজারীবাগ পার্কে আরজু মিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বৃষ্টিতে ভিজে সহস্রাধিক মানুষ জানাজায় অংশ নেন।
সাংসদ ফজলে নূর তাপস ও সাবেক সাংসদ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনসহ হাজারীবাগ থানা ও ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জানাজায় অংশ নেন। এরপর লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
জানাজার সময় দেওয়া বক্তব্যে সাংসদ তাপস বিষয়টিকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান।
এসব ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে সাংসদ ফজলে নূর বলেন, ‘আরজু নিরীহ-নিরপরাধ ছেলে। তাকে র্যাব ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেছে। ওখানে সেদিন যে ছেলেটা (রাজা) মারা গেছে, তার পরিবারই বলছে সে মাদকাসক্ত। সে চুরি করেছে, তাকে হয়তোবা লোকজন একটু মারধর করেছে। পরে তার (রাজার) আত্মীয় শামীমই তাকে বেশি মারধর করেছে। শামীম বুকের ওপর এমনভাবে ছেলেটাকে মেরেছে যে পরে সে মারা গেছে। ওটা একটা দুর্ঘটনা। আমরা এ জন্য দুঃখিত। এখানে আরজুর কোনো অপরাধ থাকলে তার জন্য আইন ছিল, বিচার হতো। কিন্তু এ রকম একটা ছেলে, যার কোনো ব্যাড রেকর্ড নাই, কোনো মামলা-জিডি পর্যন্ত নাই, সেই ছেলেটাকে ধরে নিয়ে গিয়ে সকালবেলায় মেরে দিল। এটা কোনো কথা হতে পারে? এটা তো কোনো যৌক্তিক ঘটনা হতে পারে না!’
এটিকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে র্যাব যে দাবি করছে, সে বিষয়ে সাংসদ তাপস বলেন, ‘এটা (বন্দুকযুদ্ধ) একটা তথাকথিত গৎবাঁধা কথা। এটার কোনো মানে হয় না। এটা বিশ্বাসযোগ্যও না। এ রকম একটা নিরীহ ছেলের মৃত্যু আমি কোনোভাবে মেনে নিতে পারছি না। আমি এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছি। প্রতিবাদ জানিয়েছে সকলে। আমরা এটার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমি তো মনে করি, এটা নারায়ণগঞ্জে যে রকম একটা ঘটনা (সাত খুন) ঘটেছিল সে রকমই একটা পুনরাবৃত্তি, এ ছাড়া কিছু না।’
অবশ্য র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মঙ্গলবারই র্যাব এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছে। এর বাইরে এ বিষয়ে র্যাবের বলার মতো কিছু নেই।
মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট কমান্ডার মুফতি এ বিষয়ে বলেছিলেন, সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আরজুকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এরপর তাঁকে নিয়ে র্যাব-২-এর একটি টহল দল অভিযানে যাচ্ছিল। এ সময় কয়েকজন দুর্বৃত্ত আরজু মিয়াকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। তখন র্যাবের সঙ্গে তাদের গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে আরজু মিয়াকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


