আমেরিকা, কানাডা ও ব্রিটেনে ট্রেড শো’তে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ করানোর নামে প্রতারণা শুরু হয়েছে। জাদু ও কৌতুকশিল্পী প্রিন্স আলমগীরের নেতৃত্বে ‘হাবিব’ নামের একজন দুজন মিলে রিয়েল এস্টেট, লেদার, গার্মেন্ট, ইন্স্যুরেন্স এবং ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ব্যবসায়ীদের বোকা বানাচ্ছেন। এদের প্রধান টার্গেট উঠতি ব্যবসায়ীরা। তাদের কাছে সরবরাহ করা ব্রুশিয়ারে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল ‘আরটিভি’র নাম ব্যবহার করছেন। যদিও বিষয়টি সম্পর্কে জানে না এ বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলটি।
বিষয়টি স্বীকার করে প্রিন্স আলমগীর জানান, আরটিভি’র সঙ্গে মুখে মুখে কথা হয়েছে। এখনও কন্ট্রাক্ট হয়নি। এদিকে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে ফোন করে অফেরতযোগ্য ৩০ হাজার টাকা বুকিং দিয়ে চুক্তি করতে বলছেন প্রিন্স আলমগীর ও তার পার্টনার। এরপর কানাডা থেকে আমন্ত্রণপত্র আসার পর তিন লাখ টাকার চেক দেয়ার কথা বলছেন। তাদের দাবি, স্টলের কিছু কমিশন বাদ দিয়ে পুরো টাকা কানাডায় পাঠানো হবে। কিন্তু কিভাবে পাঠানো হবে এনিয়ে সদুত্তর দিতে পারেননি। একেক সময় একেক কথা বলছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অর্গানাইজার কোম্পানি হিসেবে ইভেন্ট প্লাস ও কানাডার কোম্পানি স্ট্রিটভিলি এক্সিকিউটিভ প্লাস রিয়েলটি ইনকরপোরেশনের কথা উল্লেখ করে ব্রুশিয়ার ছাপানো হয়েছে। কানাডা ট্রেড ফেয়ার অ্যান্ড কনসার্ট-২০১৫ শিরোনাম উল্লেখ করা ব্রুশিয়ারে বলা হয়েছে, কানাডায় ১০ লাখ বাংলা ভাষাভাষী লোক রয়েছে। তাদের কাছে বাংলাদেশের পণ্য পরিচয় করিয়ে দেয়াই এ ট্রেড শো’র লক্ষ্য।
বিভিন্ন কোম্পানির কাছে দেয়া ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি দুটি তাদের চিঠিতে অফেরতযোগ্য রেজিস্ট্রেশন ফি ৩০ হাজার টাকা, স্টল ফি তিন লাখ টাকা, কো-স্পন্সর ১০ লাখ টাকা, গোল্ড স্পন্সর ১৫ লাখ টাকা, ডায়মন্ড স্পন্সর ২০ লাখ টাকা, পাওয়ার্ড বাই ২৫ লাখ টাকা ও টাইটেল স্পন্সর ৪০ লাখ টাকার কথা উল্লেখ করেছেন।
গুলশানের নিকেতন ও রামপুরা টিভি সেন্টারের অপজিটে দুটি আলাদা অফিস থেকে কানাডা স্টল বিক্রির সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রিন্স আলমগীর ও হাবিব। গত কয়েক দিন ধরে এ দুইজন মিলে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে লোভনীয় অফার দিয়ে মোবাইলে শর্ট ট্যাক্সট মেসেজ (এসএমএস) পাঠাচ্ছেন।
বলছেন, ট্রেড শোতে অংশ নিতে আগ্রহী ৩০টি কোম্পানিকে কনফার্ম করে ফেলেছেন তারা। এ তালিকায় নামী কোম্পানি প্রাণ গ্রুপ থেকে শুরু করে বড় বড় কোম্পানি রয়েছে বলে জানাচ্ছেন। তবে উঠতি ব্যবসায়ীদের প্রধান টার্গেট করেই তারা এগুচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রিন্স আলমগীর ও হাবিবের কথায় ধরা দিলে বলা হচ্ছে, স্টলের জন্য ৩০ হাজার টাকা বুকিং দিন। এরপর আপনার বা আপনাদের কোম্পানির সঙ্গে একটি চুক্তি করবো। এরপর আমাদের একটি তিন লাখ টাকার চেক দিতে হবে। আপনার ভিসা প্রসেসিং কমপ্লিট অর্থাৎ পাসপোর্টে ভিসা লেগে গেলে টাকাটা আমরা ক্যাশ করে নেবো।
ভিসার নিশ্চয়তা কি জানতে চাইলে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যাংক স্টেটমেন্ট মজবুত রাখবেন। কোন সমস্যা হবে না। এখন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ট্রেড শো’র আয়োজন করেছি। আগামীতে অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশে ট্রেড শো আয়োজনের চিন্তা-ভাবনা করছি।
গত তিনদিন ধরে কয়েক দফা এ প্রতিবেদকের সঙ্গে প্রিন্স আলমগীর ও হাবিবের কথা হয়। তাদের কথাবার্তায় প্রতারণার বিভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে।
বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে ফোন করলে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ট্রেড শোতে অংশ নিলে প্রতি জনকে দিতে হবে দুই লাখ বিশ হাজার টাকা। এ টাকার মধ্যে তিন রাত চার দিনের পাঁচ তারকা মানের হোটেল ও একদিনের সিটি ট্যুর দেবেন তারা।
সঙ্গে থাকবে ট্রেড শো চলাকালে চা-কফি একেবারে ফ্রি, ইন্টারন্যাশনাল সিম কার্ড, একদিনের স্পেশাল ডিনার কুপন। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড শো হবে নিউ ইয়র্ক ও যুক্তরাজ্যের ট্রেড শো হবে লন্ডনে।
তবে কানাডার ট্রেড শোতে স্টল নিতে চাইলে লাগবে তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ী সেজে ফোন করা হলে স্টল বিক্রিকারী কথিত ইভেন্ট কোম্পানির মালিক হাবিব বলেন, কানাডার শো হবে অক্টোবরের ৩০, ৩১ ও ১লা নভেম্বর।
অন্য দুই দেশের ট্রেড শো সম্পর্কে জানতে চাইলে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে দেয়া বক্তব্যের অনুরূপ জবাব দেন।
এসব ট্রেড শোতে অংশ নিলে স্পেশাল কি কি সুবিধা থাকছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ভাই ছোটখাটো অনেক বিষয় থাকবে। এটা নিয়ে কি বলবো।
কার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ট্রেড শো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে জানতে চাইলে হাবিব বলেন, আমার কলিগ আছেন প্রিন্স আলমগীর। আমি ২৫শে আগস্ট পর্যন্ত একটু দেশের বাইরে থাকবো। কাল (১৮ই আগস্ট) সকালেই চলে যাবো। যদিও ১৮ই আগস্ট ফোন করে তার মোবাইল খোলা পাওয়া গেছে। এ সময় তিনি বিদেশ যাত্রার বিষয়ে বলেন, একটু কাজ পড়ে গেছে। যেতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
১৭ ও ১৮ই আগস্ট হাবিবের সঙ্গে কয়েক দফা কথা বলার পর ১৮ই আগস্ট রাত আটটা ২৩ মিনিটে জাদুশিল্পী প্রিন্স আলমগীর এ প্রতিবেদকের মুঠোফোনে ফোন করেন।
এরপর ১৯শে আগস্ট ব্যবসায়ী পরিচয়ে প্রিন্স আলমগীরের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের আধা ঘণ্টা দেখা ও কথা হয়। তিনি জানান, হাবিব আমার বন্ধু। ও আমার সঙ্গে ইভেন্ট করছে। এখন কানাডার জন্য কাজ করছি। আগামীতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার জন্য কাজ করবো। কানাডার শোতে অংশ নেয়ার জন্য কানাডা রিচমন্ড সিটি, সামি প্রোপার্টিজ ও রাজভ্যালি প্রোপার্টিজ চুক্তিবদ্ধ হয়েছি।
অফেরতযোগ্য ৩০ হাজার টাকা কি কারণে নেয়া হচ্ছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কাগজ নিয়ে আমরা কানাডাতে পাঠাবো। এরপর আমন্ত্রণপত্র প্রসেস করা হবে। আমন্ত্রণপত্র আসার পর অ্যাডভোকেটের মাধ্যমে ভিসা ফরম পূরণ করা হবে। মোটকথা আমন্ত্রণপত্র প্রসেস ও এডভোকেট খরচের জন্য এ অর্থ নেয়া হচ্ছে। ওই টাকা থেকে আমাদের কিছুই থাকবে না। তবে স্টল ভাড়ার তিন লাখ টাকা থেকে কিছু কমিশন পাবো।
এদিকে কি কি শর্ত পূরণ করলে ট্রেড শোতে অংশ নেয়া যাবে- এমন প্রশ্নে প্রিন্স আলমগীরের পার্টনার হাবিব বলেন, ক্রাইটেরিয়া বলতে যিনি ট্রেড শোতে যাবেন তার ব্যাংক স্টেটমেন্ট ঠিকমতো থাকতে হবে। কোম্পানির মালিক হলে কোম্পানির ব্যাংক স্টেটমেন্টের পাশাপাশি পার্সোনাল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট লাগবে। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট, ট্যাক্স পরিশোধের সার্টিফিকেটসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র লাগবে।
সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর প্রিন্স আলমগীর বলেন, আরটিভি আমাদের দুবাই ও কাতার প্রোগ্রামে ছিলো। তাদের সঙ্গে কথা ফাইনাল। তবে আপনি নিজে কানাডার প্রোগ্রামে যেতে চাইলে আমাকে বলতে পারেন। কোনো কোম্পানি থাকলে তার কথাও বলে দিতে পারেন। বিষয়টি অবশ্যই আমরা ভালভাবে দেখবো।
মানবজমিন অবলম্বনে
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



