গত কয়েকদিনে একেরপর এক ‘বন্ধুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটেই চলেছে। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এসব ঘটনায় যুক্তিও দেওয়া হচ্ছে। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের মত, বিচারবহির্ভূত ও এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। এখন ক্ষমতাসীন দল ও জোটের মধ্যেও এমন মত ও প্রতিবাদ উঠছে।
চলতি আগস্ট মাসে সরকারি দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের চারজন স্থানীয় নেতা কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় পর এখন নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সরকারি দলের অন্তত দুজন সাংসদ প্রকাশ্যেই ‘বন্দুকযুদ্ধে’র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বলছেন, এটা মানা যায় না।
এ প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, সরকারি দলের নেতারা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হওয়ার পর মনে হচ্ছে, সবাই এখন ক্রসফায়ারের বানানো গল্পের অবসান চায়। গত কিছুদিনে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের যে প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে, তাতে মনে হয়, এত বড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে তাদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় অথবা বোধোদয় হয়েছে।
গত বুধবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘কয়েকটা বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। সেই বন্দুকযুদ্ধে কয়েকজন মারা গেছে। আমরা কোনো সন্ত্রাসীকে ছাড় দেব না।’ আগের দিন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে।’ তবে পরে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, কোনো একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনায় নয়, তিনি সার্বিকভাবে এ বক্তব্য দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাড্ডায় ঝুট ব্যবসা নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের তিন নেতা খুন, জাতীয় শোক দিবসের দিন কুষ্টিয়ায় যুবলীগের এক নেতা হত্যা, চাঁদপুরের কচুয়ায় চাঁদার দাবিতে স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রীদের ওপর যুবলীগের হামলা, হাজারীবাগে এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা, মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। সর্বশেষ গতকালও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে যুবলীগের এক অনুষ্ঠানের পাশেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতিকে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের কঠোর অবস্থানকে দলের একটি অংশ সমর্থন করলেও মাঠপর্যায়ে তীব্র আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের একটি অংশের বক্তব্য হচ্ছে, বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে হত্যা নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা স্থাপনের মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা বলেন, সাম্প্রতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের যে বার্তা দিয়েছে, তা নিয়ে মাঠে নেতা-কর্মীদের মধ্যে স্বস্তির চেয়ে শঙ্কাই বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। বিরোধী দল অনেকটা নিষ্ক্রিয় থাকায় আর্থিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে মাঠে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগই। তাই অনেক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ নিতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ও প্রবীণ সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, বিএনপি ক্রসফায়ারের মাধ্যমে সন্ত্রাসের যে সমাধান খুঁজেছিল, তা এখনো চলছে। তাঁর মতে, আইনি প্রক্রিয়ায় ও রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এই সভাপতি গতকাল বলেন, সুশাসন ও আইনের শাসন সুদৃঢ় হলে, গণতান্ত্রিক দায়িত্ববোধ সবার মধ্যে জাগ্রত হলে এবং গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড কমে আসবে।
সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপস বন্দুকযুদ্ধের বিষয়টিকে তথাকথিত গৎবাঁধা গল্প বলে উল্লেখ করে এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। রাজধানীর হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আরজু মিয়া কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই সাংসদ।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, এ ধরনের মৃত্যু নিয়ে কেউ যদি আপত্তি তোলে বা মামলা করে, তাহলে শুরুতেই আইনের ধারা অনুযায়ী বিচারিক হাকিম ‘জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি’ করাতে পারেন। পুলিশও সেই তদন্ত করতে পারে। আদালত পুলিশকে সে দায়িত্ব দিতে পারেন।
এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আমি এ রকম ঘটনার আউট অব ল-বুক ইনকোয়ারির পক্ষে না। কারণ, আইনের বইয়ে আছে, কীভাবে ইনভেস্টিগেশন হয়, কীভাবে ইনকোয়ারি করতে হয়।


