বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জর্দানে পাচার নারী কর্মী: এমন কোনও কাজ নেই যা হয়নি!

Jorden_BD-Ladyজর্ডানে পাচার হওয়া চম্পা বেগমকে (১৮) দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আট মাস আগে তাকে গার্মেন্টেসে চাকরির প্রলোভন দিয়ে জর্ডানে পাচার করা হয়। আইনী প্রক্রিয়ার জন্য রবিবার চম্পাকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পঞ্চগড় থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রঞ্জু আহমেদ।

এর আগে পঞ্চগড় থানায় শনিবার ২২ আগস্ট বিকেলে চম্পাকে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা ও স্বজনরা। স্বজনদের ফিরে পেয়ে চম্পাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জর্ডানে থাকা অবস্থায় এমন কোনো নির্যাতন নেই যা তার ওপর করা হয়নি।’

পুলিশ ও চম্পার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জেলার সদর উপজেলার আমবাড়ি গ্রামের জয়নাল আবেদীনের মেয়ে চম্পা পাশের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের এক আইনজীবীর বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি নবম। আট মাস আগে চাচী রাজিয়া খাতুন তাকে বিদেশে পাঠানোর কথা বললে প্রথমে তিনি রাজি হননি। এর পর ৩০ হাজার টাকার বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে এবং দুবাইয়ে গৃহকর্মীর কাজ দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ৮০ হাজার টকা নেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বোদা উপজেলার থানাপাড়া গ্রামের আবন আলীর ছেলে শহীদুল ইসলাম (৩৫) এবং নাসির উদ্দিনের ছেলে নজরুল ইসলাম (৪০) টাকা গ্রহণ করে ২৫ ডিসেম্বর চম্পাকে ঢাকার ফকিরাপুলে অবস্থিত উইংস ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে যায়। ওই এজেন্সির মাধ্যমে ২৮ ডিসেম্বর চম্পাকে জর্ডানের বিমানে তুলে দেওয়া হয়।

চম্পা বলেন, ‘বিমানে ওঠা পর্যন্ত কিছুই জানতাম না। কোথায় যাচ্ছি, কোন দেশে যাচ্ছি। জিজ্ঞাসা করলে ট্রাভেল এজেন্সির লোকজন বলেছিল, দুবাই যাচ্ছ তুমি।’

জর্ডান বিমানবন্দরে নামার পর তাকে একজন বাঙালী গ্রহণ করেন। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বিমানবন্দর থেকে ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে একটি ছয়তলা ভবনে। লোকটি একটি কক্ষে ঢুকিয়ে দরজায় তালা দিয়ে চলে যায়। পরদিন সকাল থেকে চম্পার ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ।

পরে ওই ভবনে কিছু বাঙালীর সাক্ষাৎ পান চম্পা। তারা তাকে জানান, এটা দুবাই নয় জর্ডান। এখানে নারীদের বিক্রি করা হয়।

চম্পা অভিযোগ করেন, ‘এমন কোনো নির্যাতন নেই যা করা হয়নি। দুই দিন পর জর্ডানের আল বারাকা ট্রাভেলসের এক কর্মচারী আমাকে দেহ ব্যবসা করার জন্য প্রস্তুত হতে বলে। আমাকে যেখানে পাঠানো হবে সেখানেই যেতে হবে। না হলে গলা কেটে দেওয়া হবে। ওই লোকদের কারও নাম আমি জানি না।’

তবে কাগজপত্র অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, জর্দানের আলবারাকা ট্রাভেলসের মাধ্যমেই তাকে দেশে ফেরত দেওয়া হয়েছে। দেশের বাড়িতে ফোন করতে চাইলে চম্পাকে ফোন করতে দেওয়া হতো না।

চম্পা আরও বলেন, ‘এক দিন পালিয়ে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশের কাছে আশ্রয় নিই। জর্ডান পুলিশ আবার আলবারাকা ট্রাভেলসের এক কর্মকর্তার হাতে আমাকে তুলে দেয়। তবে এবার তারা আমাকে গৃহকর্মীর কাজ দেয়।’

এদিকে বিদেশে যাওয়ার পর যোগাযোগ না থাকায় চম্পার পরিবার অস্থির হয়ে পড়ে। বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে। পাচারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, চম্পা দুবাইয়ে ভাল আছে। হঠাৎ এক দিন আশ্রয় পাওয়া গৃহকর্তার ফোন থেকে বড় বোন রেজিয়া আক্তারকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে চম্পা বলেন, ‘আপু আমি ভাল নেই। যেমন করে হোক আমাকে নিয়ে যাও।’

ওই ঘটনার পর চম্পার মা মরিয়ম বেগম তিনজনকে আসামি করে পঞ্চগড় থানায় মামলা করেন। পঞ্চগড় থানার পক্ষ থেকে গত জুন মাসে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় সাব-ইন্সপেক্টর রঞ্জু আহমেদকে।

দায়িত্ব পেয়েই এক নম্বর আসামি নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করেন এসআই রঞ্জু আহমেদ। তিনি যোগাযোগ করতে থাকেন উইংস ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে। তাদের নানা ধরনের আইনী জটিলতা দেখিয়ে কৌশলে তিনি কিছু প্রলোভন দেন। উইংস ট্রাভেল চম্পাকে ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়। কিন্তু ৬০ হাজার টাকা দাবি করে।

চম্পার মা মরিয়ম বেগম বলেন, ‘মোর ভিটেবাড়ি ছাড়া কিছু নাই।’ বড় বোন রেজিয়া বেগম বলেন, ‘আমরা খুব গরিব। ট্রাভেল এজেন্সি ৬০ হাজার টাকা দাবি করলে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনোমতে ৩০ হাজার টাকা দেই। বাকি টাকা পঞ্চগড় থানার এসআই রঞ্জু ভাই ব্যবস্থা করে দেন।’

সাব-ইন্সপেক্ট রঞ্জু আহমেদ বলেন, ‘চম্পার মায়ের করুণ অবস্থা দেখে আমি নিজের পকেট থেকে ৩০ হাজার টাকা ওই ট্রাভেল এজেন্সিকে দিই। তারা চম্পাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা জানায় এবং ২১ আগস্ট চম্পা দেশে ফিরে আসে। আইনী প্রক্রিয়া শেষে রবিবার তাকে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।’

পঞ্চগড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মমিনুল ইসলাম মমিন বলেন, ‘জর্ডান পুলিশ ও বাঙালী কমিউনিটি চম্পাকে ফেরত পাঠাতে সাহায্য করেছে। এ ছাড়া মামলার আইও সাব-ইন্সপেক্টর রঞ্জু ও পুলিশের কৌশলে আসামি ও ট্রাভেল এজেন্সি কর্তৃপক্ষ লুকোচুরি করার সুযোগ পায়নি।’

আরও পড়ুন