বিভিন্ন গেমসে অংশ নিতে গিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন ক্রীড়াবিদ, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা। অলিম্পিক, কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ান গেমস, ক্রিকেট ট্যুর, বিশ্ব অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপ, সুইমিং চ্যাম্পিয়ন ও ওয়ার্ল্ড হকি চ্যাম্পিয়নশিপে যোগ দিতে গিয়ে গা-ঢাকা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে বহুবার।
বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন ও ক্লাবের নাম ভাঙিয়ে আদম পাচারের ঘটনা এখন ওপেন সিক্রেট। সর্বশেষ পালিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদের স্পেশাল অলিম্পিক থেকে বাংলাদেশ দলের সুস্থ ফুটবলার জয়নাল আবেদীন।
প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের ১৫ জনের দলে আটজন যথার্থ প্রতিবন্ধী এবং সাতজন সুস্থ খেলোয়াড় থাকেন। জয়নাল শেষোক্ত দলে পড়েন। এর আগে তিনি এই দলের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ড ঘুরে এসেছিলেন।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন চলছে যে আইনে, সেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সংশোধিত আইনের ১০(ঙ) ধারায় উল্লেখ আছে, সরকার বিদেশে ক্রীড়া দল পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট সবাই বিদেশে এ আইন অনুসরণ করে যাবেন।
কিন্তু ইদানীং সরকারি অর্ডার (জিও) ছাড়া অনেক ক্রীড়া ফেডারেশন ও ক্লাব গোপনে বিদেশে দল পাঠাচ্ছে। যাদের মধ্যে অনেকেই পরে গায়েব হয়ে গেছেন। সুবিধাবাদীদের ভিড় বাড়ছে ক্রীড়াঙ্গনে। আদম ব্যবসায়ীরা ছদ্মবেশে হাজির হয়েছেন।
ক্রীড়াবিদদের উন্নয়নের জন্য নয়, আদম ব্যবসার জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে অনেক ক্লাব ও ক্রীড়া ফেডারেশন। তারা খেলাধুলার পরিবর্তে ক্রীড়াবিদদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করে।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সাইক্লিং ফেডারেশনের বিশ্বভ্রমণে পাঠানো চার সাইক্লিস্ট বেলজিয়াম গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে ঠাঁই নিয়েছিলেন জেলহাজতে। ১৯৮৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে বাংলাদেশের পতাকা বহনকারী অ্যাথলেট সাঈদুর রহমান ডন পরবর্তী সময় যুক্তরাষ্ট্রে হারিয়ে যান। ১৯৯৪ সালে এশিয়ান গেমসে গিয়ে জাপানে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যান ডজনখানেক ক্রীড়া সাংবাদিক। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) এক কর্তা তার ছেলেকেও জাপানে রেখে এসেছেন। ১৯৯৩ সালে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি গেমস ও ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ ফুটবল, ১৯৯৬ সালে ইতালিতে প্রাক-বিশ্বকাপ হকি জন্ম দিয়েছে ক্রীড়া সাংবাদিক পালানোর ঘটনা। বিশ্বকাপ হকি ও বিশ্ব অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ইতালি ও কানাডায় গিয়ে ফেরেননি তিন ক্রীড়া সাংবাদিক। প্যারা-অলিম্পিক কাভার করার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে হারিয়ে যান আরও এক ক্রীড়া সাংবাদিক।
১৯৯৪ সালে কানাডা কমনওয়েলথ গেমসে আদম হয়ে যান প্রায় ডজনখানেক ক্রীড়া সাংবাদিক। ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকে রয়ে যান অ্যাথলেট বিমল চন্দ্র তরফদার, শাহজালাল মবিন ও সাঁতারু কারার মিজানুর রহমান।
২০০২ সালে ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে গিয়ে পালিয়ে যান চার অ্যাথলেট- ফারুক রেজা, দেলোয়ার, শফিকুল ও হুমায়ুন কবির। তাদের সঙ্গে পালিয়ে যান এক ক্রীড়া সাংবাদিক।
২০০৬ সালে মেলবোর্ন কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশ হারায় অ্যাথলেট তৌহিদুলকে। ইতালিতে বিশ্ব বাছাই হকিতে খেলতে গিয়ে হারিয়ে গেছেন হায়দার আলম ও এহতেশাম। আরেক হকি খেলোয়াড় কিরণ জার্মানির শ্রমবাজারে হারিয়ে গেছেন।
২০০৭ সালে ফুটবলার বেলাল লন্ডনে প্রীতি ম্যাচ খেলতে গিয়ে আর ফেরেননি।
২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় বিশ্ব উন্মুক্ত দাবা প্রতিযোগিতায় যাওয়ার উদ্দেশে সরকারের জিও নিতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন চার নকল দাবাড়ু।
১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চার শুটার পাচারের তৎপরতা ভেস্তে গেলেও ওয়ার্ল্ড কাপ শুটিংয়ে অংশ নিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরেননি আফজাল ও রুবেল। আরেক শুটার নাসির উদ্দিন জনি পালিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রে।
একটা সময় সাইক্লিং, সাঁতার ও রোইংয়ের ব্যানারে অহরহ আদম পাচার হতো। অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করা হয়েছে ছয় সাঁতারুকে। সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাঁতার ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এক সহকারী সচিব।
শুধু যে ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সাংবাদিকরাই পালিয়েছেন তা নয়, ক্রীড়া সংগঠকরাও পালাচ্ছেন। অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের দু’সদস্য মোস্তাক ও ইকবালের পর গত বছর বিশ্ব অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন থেকে কানাডায় গিয়ে আর ফেরেননি ফেডারেশনের সহসভাপতি মঞ্জুর মোর্শেদ।
ইতালিতে উন্নত প্রশিক্ষণে অংশ নিতে গিয়ে ফিরে আসেননি কলম্বো সাফ গেমসে স্বর্ণজয়ী অ্যাথলেট মাহফিজুর রহমান মিঠু।
২০০৭ সালে বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে ইতালির মিলানে গিয়ে দেশমুখো হননি দু’কর্মকর্তা আবদুর রশিদ ও আওলাদ এবং বক্সার মহিউদ্দিন।
‘ক্রিকেট’ নতুন করে ক্রীড়া সাংবাদিকদের পালানোর মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রিকেটের বিভিন্ন ট্যুর ও টুর্নামেন্ট কাভার করার জন্য লন্ডনে গিয়ে ফেরেননি হাফ ডজন ক্রীড়া সাংবাদিক।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে গেছেন বেশ ক’জন ক্রীড়া সাংবাদিক। হ্যান্ডবলের এক কোচ ডেনমার্কে গিয়ে ফেরেননি বেশ ক’বছর আগে। সিতোরিও কারাতে দো’র কোচ ফ্রান্সে সপরিবারে পাড়ি জমিয়েছেন খেলাটিকে ব্যবহার করে।
যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে গত বছর ফিরে আসেননি দাবাড়ু চপল। ২০১৩ সালে সরকারি জিও জালিয়াতি করে তুরস্কে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল ১৪ সদস্যের কারাতে দল। দূতাবাসের সন্দেহ হওয়ায় আটকে দেয়া হয়েছিল সে দলটিকে। ফ্রান্স ও মালয়েশিয়ায় পালিয়েছেন বেশ ক’জন কারাতে খেলোয়াড়। ২০১৪ সালে কোরিয়ার ইনচন এশিয়াডে গিয়ে পালিয়ে যান কারাতেকা শামীম ওসমান। তার আগের বছর ট্রেনিং কোর্সে অংশ নিতে গিয়ে কোরিয়ায় থেকে গেছেন দুই সাইক্লিস্ট আজিজুল ইসলাম ও জাহিদ হোসেন। গত মে মাসে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে গিয়ে সেখানে রয়ে যান বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ডেলিগেট সমন্বয়কারী মো. সেলিম উদ্দিন (পাসপোর্ট নং-বিই ০১৮৭০৭)। সর্বশেষ পালালেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী দলের সঙ্গে যাওয়া সুস্থ ফুটবলার জয়নাল আবেদীন। ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী যুবক ক্রীড়া সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়েছেন। বিদেশে ভিসা নিয়ে পালিয়ে গেছেন তারা। ক্রীড়াঙ্গন ও ক্রীড়া সাংবাদিকতাকে কলুষিত করেছেন। দেশে ফিরে এসে কেউ কেউ আবার যুক্ত হচ্ছেন ক্রীড়া সাংবাদিকতায়।
এ প্রসঙ্গে বর্ষীয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘এসব ঘটনা জাতির জন্য লজ্জাজনক। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী এই ব্যক্তিদের শুধু ক্রীড়াঙ্গনে নিষিদ্ধ করলেই চলবে না। দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার ও বিওএ’র উচিত ভবিষ্যতে এদের কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা না করা।’
যুগান্তর অবলম্বে-
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


