বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

অ্যাকাউন্ট কার না জেনেই টাকা দিয়েছি

court_jan-01_157933জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার মুফতি হারুন ইজাহারসহ হেফাজতে ইসলামের মামলা পরিচালনার জন্য মক্কেলের সঙ্গে টাকা লেনদেনের কথা আদালতে জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। জঙ্গি অর্থায়ন করেননি দাবি করে জবানবন্দিতে শাকিলা বলেন, হেফাজতের নেতাকর্মীদের জামিন করানোর জন্য মক্কেলের সঙ্গে এক কোটি ২০ লক্ষ টাকায় শাকিলা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। এর মধ্যে ১২ লক্ষ টাকা রেখে বাকি এক কোটি আট লক্ষ টাকা তিনি ফেরত দেন বলে জবানবন্দিতে জানান। তবে না জেনেই হামজা ব্রিগেড নেতা মনিরুজ্জামান মাসুদ ওরফে ডনের অ্যাকাউন্টে টাকা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন শাকিলা।

বুধবার সকাল ১০টার দিকে তাদের চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেট আদালতে হাজির করে জবানবন্দি দিতে চিন্তাভাবনা করার জন্য তিন ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। এরপর তারা জবানবন্দি দিতে রাজি হলে দুপুর সোয়া ১টার দিকে তা নেওয়া শুরু হয়। অন্য দু্ই আসামিরা হলেন- শাকিলা ফারজানার সহযোগী আইনজীবী হাসানুজ্জামান লিটন ও মাহফুজ চৌধুরী বাপন।

জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার এ তিন আইনজীবী হাটহাজারী থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পৃথক মামলায় বেলা সোয়া ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেট শহীদুল আলমের কাছে জবানবন্দি দেন। তবে জবানবন্দিতে এই তিন আইনজীবী কী স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আদালত সূত্র জানায়, দুপুর সোয়া ১টা থেকে বিএনপি নেতা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল আলমের খাসকামরায় জবানবন্দি দেওয়া শুরু করেন। এরপর একে একে অপর দুই আইনজীবীও জবানবন্দি দেন। এরপর আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে তিন আইনজীবীর কৌসুলীরা তাদের জামিনের আবেদন জানান। শুনানি শেষে অপর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোসাদ্দেক মিনহাজ তাদের জামিন নামঞ্জুর করেন।

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলী ও জেলা পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম সাংবাদিকদের বলেন, জবানবন্দিতে জঙ্গিদের সঙ্গে টাকা লেনদেনের কথা ব্যারিস্টার শাকিলাসহ তিন আইনজীবী স্বীকার করেছেন। জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেছেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে ব্যারিস্টার শাকিলা হেফাজতের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ইজাহারুল ইসলামের ছেলে মুফতি হারুন ইজাহারের মামলা, লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের মামলা পরিচালনা, হেফাজতে ইসলামের মামলার আসামিদের জামিন নিতে উচ্চ আদালতে দৌঁড়ঝাপ, মনিরুজ্জামান মাসুদ ওরফে ডনকে আগেই সরকারবিরোধী মামলায় জামিন করানো, ওসমান আমিন নামে একজনের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সহানুভূতিশীল থাকাসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। মামলা পরিচালনার জন্য কয়েক ধাপে টাকা নেয়া এবং সেগুলো নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দেয়ার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেছেন।

এছাড়া হেফাজতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মুফতি ইজাহারের পরিচালনাধীন লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের মামলার সব আসামির জামিন হাইকোর্ট থেকে শাকিলা করিয়েছেন বলেও জবানবন্দিতে তিনি জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে শাকিলা জানান, ২০১৪ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে চুক্তি অনুযায়ী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চে হেফাজতে ইসলামের আসামিদের জামিন শুনানি করতে থাকেন। কিন্তু জামিন করাতে ব্যর্থ হন। কিছুতেই জামিন করাতে পারছিলেন না। অ্যাডভোকেট ডেইজি মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘর্ষের মামলায় হেফাজত ইসলামের কিছু নেতাকর্মীর জামিন করিয়ে নেন। এসময় মাসুম এসে শাকিলার কাছে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, অ্যাডভোকেট ডেইজি জামিন করিয়ে নিচ্ছেন আর আপনি কিছুই করতে পারছেন না। মাসুম বিরক্ত হয়ে টাকা ফেরত চান এবং শাকিলাও বিরক্ত হয়ে তা ফেরত দিতে রাজি হন। মাসুম শাকিলাকে সানজিদা এন্টারপ্রাইজের একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর দেন।

২০১৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে শাকিলা ধানমন্ডিতে ডাচ বাংলা ব্যাংকে মাসুমের বর্ণিত অ্যাকাউন্টে ২৫ লক্ষ টাকা জমা দেন। ডিপোজিট স্লিপে আমার নাম-ঠিকানা ছিল। পাঁচ-ছয়দিন পর শাকিলার জুনিয়র অ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটনের মাধ্যমে আরও ২৭ লক্ষ টাকা জমা দেয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে লিটনকে দিয়ে শাকিলা ডাচ বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে একবার ১৬ লক্ষ, আরেকবার ১৫ লক্ষ টাকা জমা দেন। টাকা জমা দেয়ার সময় লিটন শাকিলাকে ফোন করে জানতে চান-ডিপোজিট স্লিপে কার নাম-ঠিকানা দেবেন? শাকিলা লিটনকে তার নাম-ঠিকানা দিতে বলেন। মানিলন্ডারিং ও ট্যাক্স সংক্রান্ত ঝামেলা এড়াতে শাকিলা এ নির্দেশ দেন।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে শাকিলা ও অ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন গিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় ২৫ লক্ষ টাকা জমা দেন। এর ডিপোজিট স্লিপে বাপনের নাম-ঠিকানা ছিল। ওসমানের দেয়া‍ এক কোটি ২০ লক্ষ টাকা থেকে ১২ লক্ষ টাকা নিজে ফি ও মামলা পরিচালনার খরচ বাবদ কেটে রেখে বাকি এক কোটি আট লক্ষ টাকা তিনি ফেরত দেন।

আরও পড়ুন