নাম মোহাম্মদ ইয়াসিন মিয়া। নব্বইয়ের দশকে ছিলেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লোডার (কুলি)। তখনই তাঁর পরিচয় যুবলীগ নেতা বদরুল আলম শ্যামলের সঙ্গে। এরপর শুধুই অগ্রযাত্রার গল্প। চাকরি ছেড়ে যোগ দেন ছাত্রলীগে। অথচ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া তাঁর। মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বিমানবন্দর থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। এর আগে ছিলেন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাসের ঢাকা মহানগর উত্তরের ক্রীড়া সম্পাদক।
অল্প সময়েই হয়েছেন প্রচুর টাকার মালিক। উত্তরা ও আশকোনায় আছে ফ্ল্যাট-বাড়ি। চড়েন ঝাঁ-চকচকে সর্বশেষ মডেলের প্রিমিও গাড়িতে। থানায় মামলা আছে একাধিক।
থাকেন উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডে ৬ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে। এ ছাড়া উত্তরাতেই আছে তাঁর আরো তিনটি ফ্ল্যাট, আশকোনায় প্রচুর সম্পদ।
এই ইয়াসিনের দাপটে শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তটস্থ। সম্প্রতি বিমানবন্দরে কাস্টমস কর্মকর্তাদের পিটিয়ে পণ্য লুট করে আলোচনায় এসছে সে।
ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহম্মেদ বলেছেন, ইয়াসিন ছাত্রলীগের কোনো পদে নেই। ওই লোক দাগি অপরাধী। কিন্তু তিনি তো এখন বিমানবন্দর থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি- এ তথ্য জানানোর পর মহিউদ্দিন বলেন, ২৫ আগস্ট তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কমিটিতে তাঁর নাম কিভাবে এসেছে তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, ‘হয়তো ইয়াসিন ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে ফায়দা লুটছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘ইয়াছিন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। সে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি।’
দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াসিনের চক্র শাহজালাল বিমানবন্দরসহ আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা রাজনৈতিক পরিচয়ে বিমানবন্দর থেকে চোরাই পণ্য লুটপাট করেন। তাদের ভয়ে কাস্টমস কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও তটস্থ থাকেন।
শাহজালাল বিমানবন্দরের একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর কাছে আমরা জিম্মি। গত ১০ আগস্ট তিন কাস্টমস কর্মকর্তাকে মারধর করে অন্তত কোটি টাকার চোরাই পণ্য লুট করা হয়। এর আগেও একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। থানায় অভিযোগ করলে আরো বেশি হয়রানির শিকার হতে হয়।’
এদিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চোরাচালান, হামলা, কাস্টমস কর্মকর্তাদের মারধরসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে বিমানবন্দর থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ইয়াছিন মিয়াকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সে বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে হামলা ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের মারধরের মামলার এজাহারভুক্ত ৫ নম্বর আসামি।
২৫ আগস্ট বিমানবন্দর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ আলম দিপু ও সাধারণ সম্পাদক এসএম লিজাউর রহমান বিপুল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বিপুল জানান, সংগঠনের অজান্তেই কার্গো কমপ্লেক্সে হামলাসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে ইয়াসিন। বিষয়টি তাদের নজরে এলে সোমবার তাকে বহিষ্কার করা হয়।
জানা গেছে, ১০ আগস্ট যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পরিচয়দানকারী বদরুল আলম শ্যামল ও ইয়াছিন মিয়া গ্রুপ কাস্টমস কর্মকর্তাদের মারধর করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে কুরিয়ার ইউনিট থেকে প্রায় ৮ কোটি টাকার পণ্য লুট করে।
এ ঘটনায় ঢাকা কাস্টম হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা শাহজাহান আলী বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি যুবলীগ নেতা জসিম উদ্দিন, আনিসুর, জহাঙ্গীর, সৌরভসহ ৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
কাস্টমস সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সের কুরিয়ার ইউনিটে যুবলীগ নেতা বদরুল আলম শ্যামলের নেতৃত্বে অর্ধশত সন্ত্রাসী প্রবেশ করে। তারা বিল এন্ট্রি ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সুযোগ না দিয়ে বেশ কিছু কার্টন জোর করে বের করে নেয়ার চেষ্টা করেন। কাস্টমস কর্মকর্তারা বাধা দিলে তাদের বেধড়ক মারধর করা হয়।
মামলায় ৮ জনকে এজাহার নামীয় আসামি ও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলার আসামিরা সবাই স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী।
আসামিরা হলেন বদরুল আলম শ্যামল, তার ভাই ফকরুল আলম প্রিন্স, যুবলীগ কর্মী শহীদুল ইসলাম অপু, হাদীস উল্লাহ, ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসিন, আসাদ, সুমন ও মোহাম্মদ আলম।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


