তোলপাড় চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। ক্ষমতাসীন দলের অন্দর মহলের এ আবহ আর কিছুদিন অব্যাহত থাকলে তাদের জোটেও ফাটল ধরতে পারে- আশংকা সংশ্লিষ্টদের। পরিস্থিতি উত্তরণে দল ও জোটের সর্বত্র সমন্বয় করতে সিনিয়র নেতাদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের দাবি উঠেছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা বা বক্তব্য দেয়ার জন্য সরকার অথবা ক্ষমতাসীন দলে সুনির্দিষ্ট কোনো নেতাকে মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার কথা বলছেন কেউ কেউ। এতে নীতিনির্ধারকদের যখন-তখন বক্তব্য দেয়া বন্ধ হবে বলে মনে করছেন তারা।
বছরের শুরুতে টানা অবরোধে নাশকতামূলক নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে বিভিন্ন মামলায় আসামি হন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা। বর্তমানে এদের অনেকে জেলে রয়েছেন। যারা জেলের বাইরে রয়েছেন তাদের অধিকাংশই গ্রেফতার এড়াতে আÍগোপনে আছেন। আর প্রকাশ্যে থাকলেও আছেন নিষ্ক্রিয়। এ অবস্থায় ময়দান ফাঁকা পেয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন শাসক দলের নেতাকর্মীরা। তাদের প্রতিপক্ষ এখন মাঠের বিরোধী দল বিএনপি নয়, নিজ দলের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে ঘটছে ধারাবাহিক সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা। সম্প্রতি সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের খুনাখুনিতে অতিষ্ঠ আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড সন্ত্রাস দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। এর পরপরই কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা। কিন্তু এ বন্দুকযুদ্ধে রাজধানীর এক ছাত্রলীগ নেতার নিহতের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের এক এমপির তীব্র প্রতিবাদে বিব্রত অবস্থায় পড়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়াও সরকারের এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে জোর করে জমি কেনা ও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। আদর্শিক প্রতিপক্ষ নয়, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ সরকার সমর্থক সংগঠন ও ব্যক্তির। যার কারণে এ ঘটনায় ওই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন আরও দুই মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের এক শীর্ষ নেতা।
এছাড়া দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনায় সরকারের নীতিনির্ধারকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। যা ক্ষমতাসীন দল ও সরকারে এক ধরনের অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এসব ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- মাগুরায় ছাত্রলীগের দু’গ্র“পের বন্দুকযুদ্ধে অন্তঃসত্ত্বা মহিলা নাজমা বেগম ও তার পেটের শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়া, রাজধানীর বাড্ডায় ট্রিপল মার্ডার, কুষ্টিয়ায় শোক দিবসে প্রতিপক্ষের গুলিতে কর্মী নিহত, সিলেট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আরও দুই কর্মীর হত্যাকাণ্ড এবং সর্বশেষ হাজারীবাগে ছাত্রলীগ নেতার নির্দেশে যুবককে পিটিয়ে মারার ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব ঘটনার ব্যাপারে ১৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে কঠোর হুশিয়ারি ঘোষণার পর ওই রাতেই বন্দুকযুদ্ধে ছাত্রলীগের দুই নেতা নিহত হন। এরপর কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের আরেক নেতা নিহত হন বন্দুকযুদ্ধে। গাজীপুরেও বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারান সরকারি দলের আরেক নেতা।
বন্দুকযুদ্ধে নিহত হাজারীবাগ ছাত্রলীগের সভাপতি আরজুকে নিরপরাধ ও নিরীহ ছেলে দাবি করে সরকারি দলের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস তার স্মরণসভায় বলেছেন, আরজুর বিরুদ্ধে একটি জিডিও নেই। তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি বেঁচে থাকতে আরজুর মতো আর কাউকে হারাতে দেব না। তিনি বলেন, যদি কেউ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মারা যায় তাহলে তার সব দায়িত্ব সেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে নিতে হবে। ইতিমধ্যে আরজু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় আদালতে মামলা করেছে তার পরিবার। তার আগে র্যাব-২ এর অধিনায়ক এবং পুলিশের সহকারী কমিশনারকে প্রত্যাহার করা হয়।
অন্যদিকে আরজু নিহত হওয়ার পরের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে সরকার। অপরাধী ছাত্রলীগ আর যুবলীগ হোক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তিনি ক্রসফায়ার নয়, আরজু বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে বলে জানান।
সোমবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সরকারি দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর মধ্যে খুনাখুনি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেন সরকারি দলের সিনিয়র নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি পরিহার করে নীতি ও আদর্শের মাধ্যমে দলে শৃংখলা ফেরানোর আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগের এ উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য বলেন, এখনই আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর মাঝে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রথমে ছাত্র সংগঠনকে নীতিপরায়ণ ও আদর্শের দিকে নিয়ে যেতে হবে। এজন্য ছাত্রলীগের সাবেক নীতিপরায়ণ নেতা তোফায়েল আহমেদ, ওবায়দুল কাদের ও সৈয়দ আশরাফকে নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকেই শৃংখলা ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে বলে মন্তব্য করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, টাস্কফোর্স হলে কেন্দ্রীয় নেতারা সারা দেশে ঘুরলেই ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সংগঠনে শৃংখলা, আদর্শ ও নীতিপরায়ণতা ফিরে আসবে।
এর আগে ২৩ আগস্ট সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ মামলার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। সেখানে আপনি মাথা ঢুকাবেন কেন? তাছাড়া আমাদের সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো পঙ্গু বা মহিলা হলে তাকে জামিন দিতে হবে। আপনি জামিন না দিয়ে তাকে রিমান্ডে দিলেন, আবার ২ দিন পর ডেকে এনে জামিন দিলেন। এটা খুবই দুঃখজনক। এসব ঘটনা প্রমাণ করে আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো কন্ট্রোল নেই।’ ১৬ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ফরিদপুরে দায়ের হওয়া একটি মামলায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন সম্পর্কে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন।
শুধু অন্তর্কলহ ও খুনাখুনি নয়, নীতিনির্ধারকদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সরকারের মধ্যকার অস্থিরতার চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। সোমবার ঢাকায় এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী শর্ত পূরণ করতে না পারার কারণেই পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা জিএসপি বাস্তবায়ন হয়নি বলে মন্তব্য করেন। মিরপুরে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি আরও বলেন, শ্রমমানের উন্নয়নে আমরা যেসব অঙ্গীকার করেছি তা পূরণ করতে হবে। তাহলে আমরা জিএসপি ফিরে পাব। সুশাসনের অভাব ও প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এর আগে ১১ আগস্ট একই বিষয় অর্থাৎ জিএসপি না পাওয়াকে দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্য করে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, শুধু রাজনৈতিক কারণেই মার্কিন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার (জিএসপি) তালিকায় বাংলাদেশকে বিবেচনায় রাখা হয়নি। তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের আরও বলেন, যেখানে পাকিস্তানকে জিএসপি দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশ পায়নি। কিন্তু দেশটির আইনশৃংখলা পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা সবাই জানি।
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম


