বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সেঞ্চুরি পার করলো পেঁয়াজের দাম

29তিন দফা বাড়িয়ে পেঁয়াজের সর্বনিম্ন রফতানিমূল্য টনপ্রতি ৭০৫ ডলার নির্ধারণ করেছে ভারত সরকার। অথচ এই বাড়তি দামেও রফতানি করছেন না বাংলাদেশের মোট চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণকারী দেশটির ব্যবসায়ীরা। উল্টো সে দেশে পাচার ঠেকাতে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় কড়া পাহারা বসিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এসবের টানাপড়েনের মধ্যে ভারতের খুচরা বাজারে পেঁয়াজের মূল্য ছুঁয়েছে শত রুপি। সেঞ্চুরি হয় হয় অবস্থা বাংলাদেশের বাজারেও। ক্রেতাদের পাশাপাশি পেঁয়াজের ঝাঁজে নাস্তানাবুদ প্রশাসনও শেষ পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে। অভিযান শুরু হয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। উদ্যোগ নেয়া হয়েছে পাকিস্তান, মিয়ানমার ও নেপাল থেকে স্পর্শকাতর এ পণ্যটি আমদানির।
দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় সেগুলোর একটির সাথে অন্যটির মিল নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পূর্বাভাস সেলের তথ্য মতে, দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ মেট্রিক টন। এ বছর দেশে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৩০ হাজার টন। সেই হিসাবে পেঁয়াজের ঘাটতি থাকার কথা দুই লাখ ৭০ হাজার টন। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৯২ হাজার টন পেঁয়াজ। খালাসের অপেক্ষায় আছে আরো এক লাখ টনের মতো। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতউল্লাহ আল মামুনের দাবি, আগামী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা আছে তার সবটুকুই মজুদ আছে। অথচ বাস্তবতা হলো, বাজারে পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
পাইকারি বাজারে এ দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা কম। অথচ বর্তমানে বাজারে যেসব বিদেশী পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো আরো অন্তত এক মাস আগে আমদানি করা। তখন আমদানিমূল্য ছিল ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পূর্বাভাস সেলের অনুমান, ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য বাড়িয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার অনেকাংশেই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির কৃষিজাত পণ্যের মূল্য নির্ধারণী সংস্থা (ন্যাফেড) কর্তৃক নির্ধারিত পেঁয়াজের সর্বনিম্ন রফতানিমূল্য ছিল প্রতি টন ২৭৫ ডলার। দুই মাস আগে হঠাৎ এ মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয় ৪৩০ ডলার। অতিবৃষ্টির কারণে পেঁয়াজের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অজুহাতে এ মাসের শুরু দিকে হঠাৎ করে সর্বনিম্ন ৭০৫ ডলার নির্ধারণ করে দেয় ন্যাফেড। উৎসদেশে তিন গুণ দাম বেড়ে যাওয়ায় অস্থিরতা দেখা দেয় দেশের বাজারে। ৪০ থেকে বাড়তে বাড়তে ১০০ টাকায় ওঠে পেঁয়াজের দাম।
এ দিকে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। সাধারণ ক্রেতাদের ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ সরবরাহ করতে টিসিবির মাধ্যমে আমদানি করার পাশাপাশি পেঁয়াজের বাজারে কারসাজি রোধে অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এ ব্যাপারে ভোক্তা অধিকার সংরণ অধিদফতর, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব পকে বাজারে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ভারতের বাজারে দাম বাড়লেই বাংলাদেশে বাড়বে এমন যুক্তি মানতে নারাজ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাদের দাবি, দেশী ও আমদানি করা পেঁয়াজের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও এ অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। একশ্রেণীর ব্যবসায়ী কৌশলে দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। কেননা ভারত রফতানিমূল্য বাড়িয়েছে গত শনিবার। নতুন দামে সেখান থেকে এখনো পেঁয়াজ আমদানি হয়নি।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আমদানি করা পেঁয়াজ দ্রুত ছাড় করতে সহযোগিতা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পেঁয়াজ আমদানিতে ঋণপত্র খুলতে কিছুটা উদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সহায়তা চেয়েছে মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি মিয়ানমারসহ কয়েকটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানিপ্রক্রিয়া দ্রুততর করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পেঁয়াজের দাম সহনীয় হয়ে আসবে বলে দাবি করেছেন বাণিজ্যসচিব।
কক্সবাজার থেকে আমাদের সংবাদদাতা জি এ এম আশেক উল্লাহ জানান, মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আসা শুরু হয়েছে। চলতি সপ্তাহে এসেছে প্রায় ১৪৯ টন এবং আগামী সপ্তাহে আরো ৫০০ টন পেঁয়াজ টেকনাফ স্থলবন্দরে ঢুকবে। আরো পাঁচশত টন আমদানির সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তাই দেশে পেঁয়াজের সঙ্কট হবে না। তবে দেশে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেলেই কেবল মিয়ানমার থেকে আমদানি করা হয় নইলে সারা বছরই পেঁয়াজের খবর থাকে না। মিয়ানমার থেকে সহজে কিভাবে সারা বছর পেঁয়াজ আনা যায় তার কোনো পরিকল্পনা এ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। তাই পেঁয়াজের বাজারটি রয়ে গেছে সম্পূর্ণ ভারতের কব্জায়। এ বিষয়ে টেকনাফ স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ বলছেন, মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আনতে খরচ বেশি পড়ে, তাই আনা হয় না। আবার অন্য পক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, মিয়ানমার থেকে সহজভাবে সারা বছর পেঁয়াজ আনার সুযোগ রয়েছে। তবে তার জন্য যে বিশেষ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন তা কখনো নেয়া হয়নি।
অন্য দিকে সীমান্তের একাধিক সূত্র মতে, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের ব্যাপকভাবে সীমান্তবাণিজ্য হোক অথবা বাণিজ্য ঘাটতি কমুক তা প্রতিবেশী একটি দেশ কোনো সময়ই চায়নি। ওই দেশটি সবসময় চেয়েছে বাংলাদেশ শুধু পেঁয়াজই নয়, সবক্ষেত্রেই তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকুক সারা বছর।টেকনাফ স্থলবন্দরের ম্যানেজার (অপারেশন) খালেদ হোসেন জানান, দেশে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় মিয়ানমার থেকে আবার পেঁয়াজ আসা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০০ টনের মতো এসেছে এবং আরো আসছে। পেঁয়ারের জন্য নতুন নতুন এলসি খোলা হচ্ছে। সীমান্তবাণিজ্য ব্যবসায়ী আলহাজ মোহাম্মদ হাশেম বলেন,কাল পরশুর দিকে পাঁচশত টন পেঁয়াজ মিয়ানমার থেকে আনা হচ্ছে। টেকনাফ স্থলবন্দর পর্যন্ত আনা প্রতি কেজি পেঁয়াজের খরচ প্রায় ৫০ টাকা পড়বে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন উদ্যোগী পরিকল্পনা নিলে এ খরচ আরো কমবে। তার মতে বর্তমানে মিয়ানমারের বাজার থেকে প্রতি টন পেঁয়াজ সাড়ে পাঁচশত থেকে ৫৭০ ডলার দিয়ে কেনা হচ্ছে। এ দিকে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ এলেও দেশের খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম কমছে না।
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম

আরও পড়ুন