বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে ২ লাখ টাকা অনুদান

rana plazaপ্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের কল্যাণে ২০০৬ সালে প্রণীত হয় শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন। এরপর ২০১০ সালে আইনটি বাস্তবায়নে বিধিমালা করে সরকার। কিন্তু বিধিমালাতে তখন শ্রমিকের দুর্ঘটনাজনিত অক্ষমতা বা মৃত্যু হলে তহবিল থেকে কী পরিমাণ অনুদান দেয়া হবে, তা নির্দিষ্ট করা ছিল না। সম্প্রতি বিধিমালাটির সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধিত এ বিধিমালা অনুযায়ী, কর্মরত অবস্থায় কোনো শ্রমিক মারা গেলে ২ লাখ টাকা অনুদান পাবে ওই শ্রমিকের পরিবার। একই হারে অনুদান পাবে দৈহিক বা মানসিকভাবে অক্ষম শ্রমিকও।

গত ২৬ আগস্ট সংশোধিত শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিধিমালা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

সংশোধিত বিধিমালায় অক্ষম শ্রমিক বা মৃত শ্রমিকের পরিবারকে ২ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেয়া ছাড়াও অসচ্ছল শ্রমিকের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা চালিয়ে নিতে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা সহায়তার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বিশেষ দক্ষতার জন্য আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও যোগ করা হয়েছে সংশোধিত বিধিমালায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপার বলেন, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন যখন হয়, তখন এ তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ জমা ছিল না। এখন এর আকার বড় হয়েছে, তাই খরচের ব্যাপ্তিও বাড়ানো হয়েছে। আর তা কার্যকর হবে জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী।

দেশে শিল্প দুর্ঘটনায় প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক হতাহত হচ্ছেন। গত বছরও শিল্পে কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় হতাহত হন প্রায় এক হাজার শ্রমিক। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর কেবল রানা প্লাজা দুর্ঘটনায়ই প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৩ জন, যাদের বেশির ভাগই পোশাক শ্রমিক। এখন পর্যন্ত এটিই বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। এছাড়া ২০১২ সালে শিল্প দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন শতাধিক। এর মধ্যে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান শতাধিক শ্রমিক।

শ্রমিকের মৃত্যুর পর কোনো অনুদান বা সহায়তা দিয়ে ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, পরিবারের ভরণ-পোষণের বিষয় বিবেচনায় অর্থসহায়তার বিষয়টি তার পরও চলে আসে। আর সে অর্থের উত্স যা-ই হোক না কেন, কোনোভাবেই এর পরিমাণ ২ লাখ টাকা হতে পারে না। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১২১ কনভেনশন অনুযায়ী। এ কনভেনশনে শ্রমিক কর্মক্ষমতা থাকার সময়সীমা হিসাব করেই পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। সরকার এখনো আইএলওর কনভেনশনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এ ধরনের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পারেনি।

দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উত্পাদন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে লাভ হলে তার ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় করার বিধান রাখা হয়েছে আইনে। এ অর্থের একটা নির্দিষ্ট অংশ সরকার গঠিত বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে জমা দিতে হবে।

২০১৩ সালে সংশোধিত শ্রম আইন অনুযায়ী, ১০০ টাকা লাভ থেকে যে ৫ টাকা শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় হবে, তার ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ তহবিলে দেয়ার পাশাপাশি ১০ শতাংশ (৫০ পয়সা) শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে জমা হবে। বাকি ১০ শতাংশ (৫০ পয়সা) প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ তহবিলে রাখতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে সংশোধিত আইনে।

তবে অনেক প্রতিষ্ঠানই শ্রমিক কল্যাণ আইন ও তহবিল সম্পর্কে সচেতন নয়। প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশে শ্রমিকদের অংশীদারিত্বের বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সহজভাবে নেন না। তাই সরকারি তহবিলে অর্থ জমা দেয়ার বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি ব্যবসায়ীরা। ফলে শুরুতে তেমন সাড়া পায়নি তহবিলটি। তবে এক বছরের ব্যবধানে তহবিলে জমার পরিমাণ ৬৬ কোটি থেকে বর্তমানে ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তহবিলে অংশগ্রহণ করা অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই বহুজাতিক।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, তহবিলে অর্থ জমা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কোটস বাংলাদেশ লিমিটেড, রেনাটা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রেনাটা লিমিটেড, ফু-ওয়াং সিরামিক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেড, লাফার্জ সুরমা লিমিটেড, টিএম টেক্সটাইল অ্যান্ড গার্মেন্টস লিমিটেড, সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড, রবি আজিয়াটা লিমিটেড, রেকিট বেনকিজার (বাংলাদেশ) লিমিটেড, আরএকে সিরামিকস (বাংলাদেশ) লিমিটেড, গ্রামীণফোন, হুয়াউই, টেকনোলজিস (বিডি), লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড, ক্রাউন সিমেন্ট লিমিটেড, এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড, বার্জার পেইন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, বাটা সু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড ও সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড।

আরও পড়ুন