বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সেবার নামে বিভিন্ন ধরনের চার্জ আরোপ করে গ্রাহকদের কাছ থেকে বছরে ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি কেটে নিচ্ছে। কেবল আমানত রাখার ক্ষেত্রেই গ্রাহকের খোলা ব্যাংক হিসাব থেকে ওই পরিমাণ অর্থ কেটে নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঞ্চয়ী হিসাবে রাখা জমা টাকাও কেটে নিচ্ছে কোনো কোনো ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তৈরি করা প্রতিবেদন অনুযায়ী মার্চ পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকগুলোতে ৭ কোটি ১১ লাখ ৪৬ হাজার ১২৬ জনের হিসাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্য এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে প্রতিবছর একটি হিসাবের বিপরীতে একজন গ্রাহকের সার্ভিস চার্জ বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক হিসাব পরিচালন ফি বাবদ ব্যাংক কেটে নিচ্ছে ৫০০ টাকা ও এটিএম কার্ড ফি বাবদ নিচ্ছে ৫০০ টাকা। বিভিন্ন সময় ব্যাংক এসএমএস পাঠানো ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের নামেও বছরে ৫৭৫ টাকা কেটে রাখা হচ্ছে। কোনো গ্রাহক এসএমএস পেতে আগ্রহী না হলেও এ চার্জ নেয়া হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা না দিলেও গ্রাহকের কাছ থেকে গণহারে এ ফি নেয়া হচ্ছে।
সূত্র জানায়, ব্যাংকিং সেবা পেতে প্রতিদিনই গ্রাহককে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলো গতানুগতিক কিছু বিষয়ে তাদের সার্ভিস চার্জের পরিমাণ শিডিউল অব চার্জেসের তালিকায় প্রকাশ করলেও অঘোষিত অনেক চার্জের তথ্যই তারা প্রকাশ করে না। ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে লেনদেনের সময়ই ওইসব লুকায়িত চার্জ কেটে নিচ্ছে। ফলে গ্রাহকরা জানতেও পারেন না তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে কী পরিমাণ টাকা কাটা হয়েছে।
কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে ব্যাংকভেদে চার্জ দিতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৫০০ টাকা। হিসাব পরিচালনার জন্য ছয় মাসের ভিত্তিতে চার্জ নেয়া হচ্ছে ১৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। চেকবই ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রতি ১০ পাতার জন্য ৬০ টাকা থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত ফি নেয়া হচ্ছে। হিসাবে বিবরণী পাঠাতে ৩০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত ফি আদায় করছে ব্যাংকগুলো। ডেবিড কার্ড দিতে ফি নিচ্ছে ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা। কার্ড রিচার্জ করতে ফি নিচ্ছে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। কার্ডের ব্যবস্থাপনার জন্য বছরে কাটা হচ্ছে ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত।
ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের জন্য ব্যাংকভেদে ফি নেয়া হচ্ছে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের জন্য ১০ হাজার টাকার বেশি তুললেই ফি কেটে নেয়া হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের আওতায় ১ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে তুললে ১০০ টাকা, ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৩০০ টাকা। ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫০০ টাকা ফি নেয়া হয়।
এছাড়া অনেক ব্যাংকে নির্ধারিত অংকের চেয়ে জমা টাকা কমে গেলে মূল টাকা থেকে বাড়তি চার্জ কেটে রাখা হয়। গ্রাহকরা নিয়মিত টাকা উঠানোর কারণে বেশিরভাগ হিসাবেই ব্যাংকগুলো মুনাফা দেয় না। আবার এক ব্যাংক গ্রাহকের অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের চার্জ নিচ্ছে ১৫ টাকা। একইভাবে স্থিতি অনুসন্ধান (ব্যালেন্স) ও ক্ষুদে বিবরণী চার্জ (মিনি স্টেটমেন্ট) জানতে নেয়া হচ্ছে ৫ টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা জমা দিয়ে হিসাব খুলতে হয়। একইভাবে হিসাব বন্ধ করতেও ব্যাংকগুলোকে দিতে হয় ২০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। একইভাবে হিসাব পরিচালনা করতে ও কোনো সনদ নিতে গেলে নানা ধরনের চার্জ আরোপ করা হয়। গ্রাহকের অজান্তেই এসব টাকা গ্রাহকের হিসাব থেকে কেটে নেয় ব্যাংকগুলো।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, ব্যাংক যদি গ্রাহকের ওপর অস্বাভাবিক চার্জ আরোপ করে তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে গ্রাহক সেখানেই যাবে যেখানে চার্জ কম পাবে।
তিনি বলেন, যেসব ব্যাংক বেশি মাত্রায় চার্জ নেয় সেক্ষেত্রে গ্রাহক অন্য ব্যাংকে আর্থিক সুবিধা নেবেন। এদিকে মাত্রাতিরিক্ত চার্জ আদায়ের দায়ে সম্প্রতি তিনটি ব্যাংকের গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত চার্জ ফেরত দিতে বাধ্য করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আরও ৭টি ব্যাংককে সতর্ক করা হয়েছে। আরও কয়েকটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এর আগে বেআইনিভাবে মাত্রাতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আদায় করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও চার্জ আদায় কমেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো যেন অতিরিক্ত চার্জ না কাটে, সে জন্য একটি নীতিমালা আছে। কিন্তু সেই নীতিমালার বাস্তবায়ন নেই। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোতে চার্জ কর্তনের তালিকা টাঙানোর কথা থাকলেও অধিকাংশ ব্যাংকই তা মানে না। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।


