টিআইএন বা ইটিআইএন ধাকলেই যে রিটার্ন জমা দিতে হবে এমন নয়। করমুক্ত সীমার নিচে আয় থাকলে আর রিটার্ন দিতে হবে না। আপনি ভোগান্তি ও ঘুষ থেকে মুক্ত!
গত করবর্ষের (২০১৪-১৫) জুলাই থেকে জুন মাসের মধ্যে আপনি যে আয় করেছেন, তা করমুক্ত আয়সীমার নিচেই রয়েছে। তাই আপনাকে বার্ষিক আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দিতে হবে না।
গত করবর্ষ (২০১৪-১৫) থেকে টিআইএন থাকলে রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত বছর বাজেট ঘোষণার সময় আয়কর অধ্যাদেশের রিটার্ন দাখিলসংক্রান্ত ৭৫ ধারা সংশোধন করা হয়েছে। এ সংশোধনের ফলে টিআইএন থাকলেও যে বছর করযোগ্য আয় হবে, সেই বছরই রিটার্ন জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া করদাতার বাসায় একটি ল্যান্ড টেলিফোন থাকলে, ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের বেশি আয়তনবিশিষ্ট বহুতল ভবন থাকলে এবং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচনের প্রার্থী হলে আয়কর বিবরণী জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু এ বাধ্যবাধকতাও উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কাদের দিতে হবে রিটার্ন?
করদাতার আয় যদি বছরে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি হয় তবে তাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। মহিলা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতার আয় যদি বছরে তিন লাখ টাকার বেশি, প্রতিবন্ধী করদাতার আয় যদি বছরে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতার আয় যদি বছরে চার লাখ ২৫ হাজার টাকার বেশি হয় তাহলে তাঁকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
তবে আয়ের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। বছরে করযোগ্য আয় থাকলে, আয় বছরের পূর্ববর্তী তিন বছরের যেকোনো বছর করযোগ্য আয় নিরূপিত হলে; সিটি করপোরেশন অথবা বিভাগীয় ও জেলা শহরের পৌরসভায় বসবাসকারীরা একটি গাড়ির মালিক হলে; মূল্য সংযোজন কর আইনে নিবন্ধিত কোনো ক্লাবের সদস্য হলে; সিটি করপোরেশন, পৌরসভা অথবা ইউনিয়ন পরিষদে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলে; ডাক্তার, দন্ত চিকিৎসক, আইনজীবী, আয়কর পেশাজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি, সার্ভেয়ার অথবা সমজাতীয় পেশায় নিয়োজিত সব ব্যক্তি; চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অথবা কোনো ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সব সদস্য; পৌরসভা, সিটি করপোরেশন অথবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব পদপ্রার্থী; সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা অথবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ঠিকাদারি কাজের টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।
একজন করদাতা সারা বছর বিনা মূল্যে আয়কর অফিস থেকে রিটার্ন ফরম সংগ্রহ করতে পারে। ফরমের ফটোকপিও গ্রহণযোগ্য।
রিটার্ন দাখিলের সময় কম্পানি ব্যতীত অন্যান্য সব শ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে প্রতিবছর ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর এই তিন মাস সময়সীমার মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব না হলে একজন করদাতা রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত কারণ উল্লেখ করে উপকর কমিশনারের কাছে রিটার্ন জমাদানের সময় বাড়ানোর আবেদন করতে পারে। সময় মঞ্জুর হলে বর্ধিত সময়ের মধ্যে সাধারণ অথবা সর্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতির আওতায় রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব।
প্রত্যেক শ্রেণির করদাতার রিটার্ন দাখিলের জন্য আয়কর সার্কেল নির্দিষ্ট করা আছে। পুরনো করদাতারা তাদের বর্তমান সার্কেলে রিটার্ন জমা দেবে। নতুন করদাতারা তাদের নাম, চাকরিস্থল বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানার ভিত্তিতে নির্ধারিত সার্কেলে আয়কর রিটার্ন দাখিল করবে। করদাতারা প্রয়োজনে কাছাকাছি আয়কর অফিস বা কর পরামর্শকেন্দ্র থেকে আয়কর রিটার্ন দাখিলসংক্রান্ত সার্কেল অফিস সম্পর্কে জানতে পারবে। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আয়কর মেলায় করদাতারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারে। রিটার্ন দাখিলের সময় করদাতা বিদেশে অবস্থান করলে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসেও রিটার্ন দাখিল করতে পারবে।
সময়মতো আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা আরোপের বিধান আছে। এ বিধান অনুসারে আয়কর অধ্যাদেশের ৭৫ ধারানুসারে নির্ধারিত/বর্ধিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ১০ শতাংশ অথবা কমপক্ষে ১০০০ টাকা এককালীন জরিমানা আরোপের এবং পরবর্তী প্রতি দিবসের জন্য ৫০ টাকা হারে জরিমানা আরোপের বিধান আছে। তবে চলতি করবর্ষে অর্থাৎ অর্থ আইন, ২০১৫-এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি করদাতার ওপর আয়কর অধ্যাদেশের ১২৪ ধারায় আরোপযোগ্য জরিমানার সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জরিমানার সর্বোচ্চ পরিমাণ হবে করদাতার সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ৫০ শতাংশ বা এক হাজার টাকা, দুটির মধ্যে যেটি বেশি। আয়কর রিটার্নে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হলে চলতি করবর্ষে প্রয়োজনে এনবিআর সংশ্লিষ্ট করদাতার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।


