কর্মস্থলে দুর্ঘটনা এবং কোরিয়ান ডাক্তারের ভুল চিকিৎসা জনিত কারণে গলা থেকে পায়ের তালু অবধি প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া অসহায় বাংলাদেশী ইমরান হোসাইন যে পরিমান অর্থ ক্ষতিপূরণ বাবদ পাবে, তার ২% দিতে হবে সিউলের বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার উইংয়ে কর্মরত নিজামুল হককে।
লোকাল রিক্রুট চিহ্নিত এই দুর্নীতিবাজ স্টাফ নেক্কারজনক অবৈধ কমিশন চুক্তিতে কৌশলে আটকে ফেলেছিল মৃত্যুপথযাত্রী হতভাগা বাংলাদেশী ইমরানকে। বহু নিরীহ বাংলাদেশীর আতংক এই ‘নিজাম স্যার’ কয়েক বছর আগে ‘বাড়ি গোপালগঞ্জ’ পরিচয়ে দূতাবাসে লোভনীয় চাকরি বাগিয়ে নেয় বলে অভিযোগ।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০১২ সালের জুলাই মাসে সিউলের একটি থার্মোফ্লাক্স কোম্পানিতে বিধি বহির্ভূত অতিরিক্ত ওজনের কার্টন একাই উত্তোলন করতে গিয়ে ইমরান আঘাতপ্রাপ্ত হবার কয়েক দিন পরই দূতাবাসের নিজামুল হকের সাথে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চায়। দু’মাসের মাথায় হওয়া ইমরানের অপারেশনের দিনক্ষণ-স্থান সবই জানতো লেবার উইংয়ের অস্বাভাবিক প্রভাবশালী এই ‘সো-কল্ড’ অফিসার। শকুন যেমন গরু মারা যাবার অপেক্ষায় থাকে, সুযোগসন্ধানী নিজামুল হক অপেক্ষায় ছিলো ইমরানের সর্বোচ্চ ভয়াবহ দুঃসংবাদের, এমনটাই বেরিয়ে এসেছে অনুসন্ধানে।
মৃত্যু যখন ইমরানের দুয়ারে কড়া নাড়ছিল, এক রাতে তিন তিন বার মেজর অপারেশনের পরপরই সমস্ত শরীর প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার পর প্রায় মাস ছয়েক হতভাগা এই বাংলাদেশীর বিন্দুমাত্র খবর নেয়নি নিজাম, শুধুমাত্র সময়মতো তার ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি নিশ্চিত করতে। এমনকি লেবার উইং বা দূতাবাসের কোন কানামাছিও ইমরানের ভালোমন্দ কিছুই দেখাশোনা করেনি তখন। যেমন পরিকল্পনা তেমন কাজ। নিজাম তার পছন্দমাফিক পূর্বপরিচিত সিভিল উকিলকে ২০% কমিশন চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ দেয় ইমরানের পক্ষে মামলা পরিচালনার নিমিত্তে। একইসাথে নিজের ২% কমিশনের বিষয়টিও পাকাপোক্ত করে নেয় দূতাবাসের এই ধূর্ত ‘স্যার’ কাম এসিস্টেন্ট।
চুক্তি অনুসারে ইমরানের পক্ষে নিজামুল হকের নিয়োগকৃত উকিল কর্তৃক বহু আগেই ২টি পৃথক মামলা দায়েরের কথা ছিল। তার মধ্যে একটি মামলা লেবার ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে, অন্যাটি কুখ্যাত সংমো হাসপাতাল ও তাদের ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। ইমরান যে কোম্পানিতে কাজ করতো সেই মালিক কর্তৃক প্রভাবিত ইনস্যুরেন্স কোম্পানি আগেই জানিয়ে দিয়েছিল ইমরান বাংলাদেশ থেকেই নাকি ইনজুরি নিয়ে কোরিয়াতে আসে ২০১১ সালে। “আমি যদি অসুস্থতা নিয়েই আসতাম তবে টানা ১ বছর কোম্পানিতে এতো সুন্দরভাবে কাজ করতাম কিভাবে”?- ভুল অপারেশনে স্পাইনাল কর্ড ড্যামেজ হওয়া ইমরানের এমন আকুতি আমলে নেয়নি লেবার ইনস্যুরেন্স।
নিজামের সাথে ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ও তথাকথিত উকিলের গোপন সমঝোতার কারণেই এমনটা হয়েছে বলে মনে করছেন সিউলের সচেতন বাংলাদেশীরা। দৃশ্যমান শক্তির নির্মম পরিহাস, ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা তো দূরের কথা, এমনকি সংমো হাসপাতাল সহ তাদের ডাক্তারদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সহ কোন মামলা করা ছাড়াই টানা ২ বছর পার করে দেয় দূতাবাসের ‘প্রভাবশালী স্যার’ নিজামের ভাড়া করা উকিল। হাসপাতালের বেডে ২৪ ঘন্টা পড়ে থাকা ইমরানকে বোঝানো হয় ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং ২%-এর এগ্রিমেন্ট যাতে ঠিক থাকে। নিরীহ এই বাংলাদেশীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই ধুরন্ধর নিজাম গোপন বোঝাপড়া সেরে নেয় প্রতারক ঐ উকিলের সাথে।
২০১৩ ও ২০১৪ এই দুই বছরে বাংলাদেশ দূতাবাসের জঘন্য নির্লিপ্ততা, ভয়াবহ উদাসীনতা, নেক্কারজনক দায়িত্বহীনতা এবং ঘৃন্য খামখেয়ালিপনার কারণে সব কলকাঠি এককভাবে চলে যায় দুই প্রতারক নিজাম ও তার সাজানো উকিলের হাতে। নতুন হাসপাতালের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা যেখানে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হন ইমরান সংমো হাসপাতাল কর্তৃক ‘রং ট্রিটমেন্ট’-এর শিকার, সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের আনাড়িপনায় প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ সহ ন্যায্য ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় ইমরান হোসাইন। ২০১৩-১৪ সালে দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রদূত এনামুল কবির যিনি সিউলে আসার আগে প্যারিসে থাকতেই ‘স্লিপিং অ্যামবাসেডর’ হিসেবে সমালোচিত ছিলেন, ইমরান ইস্যুতে তাঁকেই সর্বাগ্রে কাঠগড়ায় দাড় করাতে চান স্থানীয় বাংলাদেশীরা।
এদিকে দূতাবাসের লেবার উইংয়ের ‘কমিশন মাস্টার’ নিজামুল হকের সাথে অসুস্থ ইমরানের ২% চুক্তির কথা সম্প্রতি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে রাজধানী সিউল সহ কোরিয়ার বিভিন্ন শহরের বাংলাদেশ কমিউনিটিতে। তাঁরা বলছেন, এই নিজামই নগদ অর্থ প্রাপ্তি সাপেক্ষে তারই ভাড়াটে উকিলকে কুখ্যাত সংমো হাসপাতালের সাথে গোপন সমঝোতায় নিয়ে যায়। নিজামের বিরুদ্ধে সিউলের পথে-প্রান্তরে রয়েছে দালালী ও প্রতারণার আরো জঘন্য সব অভিযোগ। দূতাবাসের ভেতরে-বাইরে বহু লোকজনের সাথে তার অবৈধ আর্থিক লেনদেন রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে কেঁচো খুঁড়তে সাপও বেরিয়ে আসতে শুরু করছে এখন। ২% দেয়ার চুক্তি সম্পর্কে জানতে ০১০৪ ৯১৮১ ৯৬৯ এই নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভ করেনি নিজাম।
কাউন্সিলর খন্দকার মাসুদুল আলম ও লেবার উইংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রথম সচিব জাহিদুল ইসলাম ভুঁইয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা ২% সম্পর্কে কিছুই অবগত নন বলে জানায়। উল্লেখ্য, প্রতারক নিজাম কর্তৃক নিয়োগকৃত উকিল অর্থের বিনিময়ে মামলাটি বিবাদী পক্ষের অনুকুলে ছেড়ে দেবার পরিণতিতে নিম্ন আদালতে সুনির্দিষ্ট মামলার পরিবর্তে সামান্য ক্ষতিপূরণের ‘ক্লেইম’ করে ইমরানকে কৌশলে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করা হয়। রায় ইমরানের প্রতিকুলে যাবার পর ঐ একই উকিলের মাধ্যমে সম্প্রতি ‘আপিল’ তামাশার পর্বটিও সেরে নেয় নিজাম। ফোনালাপ ফাঁসের নেপথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি জনৈক বাংলাদেশী হাসপাতালে ইমরানকে দেখতে গেলে সবকিছু অবগত হবার পর ২% বিষয়ে নিজামের সাথে কথোপকথন কৌশলে রেকর্ড করে রাখে।



