বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

আখলাক হত্যায় ফায়দা লুটতে সব রাজনৈতিক দলই মাঠে

akhlakভারতের উত্তর প্রদেশের দাদরি গ্রামে গরুর গোশত খাওয়ার ‘অপরাধে’ মুহাম্মাদ আখলাখকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ফায়দা লুটতে এখন সব রাজনৈতিক দলই মাঠে নেমেছে। এ ঘটনায় ভারতজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে অস্বত্বিতে পড়া বিজেপি বিরোধীদের সমালোচনার জবাব দিতে মুজফ্ফরনগরে দাঙ্গার মূলহোতা বিতর্কিত বিধায়ক সঙ্গীত সোমকে মাঠে নামিয়ে আরোা বেকায়দায় পড়েছে।

এ প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং আখলাক হত্যাকা- ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ঘটনা বলে এটি নিয়ে রাজনীতি না করার জন্য বিরোধী দলগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছন। তিনি বলেছেন,এর উপর সাম্প্রদায়িক রঙ চড়ানোর চেষ্টাও ঠিক নয়।

এদিকে এ ঘটনায় বিরোধীদের সমালোচনার জবাব দিতে বিজেপি মাঠে নামিয়ে দিয়েছে ২০১৩ সালে মুজফ্ফরনগর দাঙ্গা খ্যাত বিতর্কিত বিধায়ক সঙ্গীত সোমকে। পরিষ্কারভাবে আক্রমণই আত্মরক্ষার সেরা উপায়- এই নীতিতে। চোরের মায়ের বড় গলাও বলা চলে। দাদরির স্থানীয় বিজেপি নেতা সঞ্জয় রানার ছেলেকে অন্যতম কুচক্রী হিসেবে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর অভিযোগের আঙুল যে বিজেপি-র দিকেই, সেটা না বোঝার কোনও কারণ নেই। আর রাজনাথ সিং বললেও রাহুল গান্ধী থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সব বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা যেভাবে দাদরিতে গিয়ে আকলাখের পরিবারের সঙ্গে দেখা করছেন, তাতে পাল্টা চাপ তৈরির নীিত নিয়েই সোমকে নামাল বিজেপি।

গেরুয়া শিবির যে এমনটাই চাইছে সেটা বোঝা গিয়েছিল। সংঘ পরিবারের আরেক সদস্য, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সাধ্বী প্রাচী মন্তব্য করেছিলেন, ঠিকই হয়েছে। যারা গরু খায় তাদের এমনই হওয়া উচিত!

দু’বছর আগে মুজফ্ফরনগরে দাঙ্গায় মারা গিয়েছিলেন কমপক্ষে ৬০ জন। ঘরছাড়া হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। সেটাও ছিল এমন সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের সময়। উগ্র, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তৃতা করে পরিবেশ আরও বিষিয়ে দিয়েছিলেন সঙ্গীত সোম। সেজন্য গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এদিন দাদরিতে গিয়ে সরাসরি অখিলেশ সরকারকে আক্রমণ করে বললেন, সংখ্যালঘু তোষণ করছে এই সরকার। নির্দোষ লোকেদের এই ঘটনায় গ্রেপ্তার করছে। কী করে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মতো একটা লোক উত্তেজনা ছড়াতে হায়দরাবাদ থেকে এখানে আসার অনুমতি পায়?

সমাজবাদী পার্টি কী ওদের সঙ্গে জোট করছে? মুজফ্ফরনগরের সময়েও এই সরকার দোষীদের উড়িয়ে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। এবারও যারা ‘গোহত্যা করেছে’ তাদের বাঁচাতে চাইছে। সোমের ইঙ্গিত শনিবার সন্ধেয় সমাজবাদী পার্টির উদ্যোগে নিহত আকলাখের পরিবারকে লখনউয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া। মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব নিজে দাদরিতে আসতে না পারায় এই পথ নেওয়া হয়। রবিবার আকলাখের মা আসগরি, ভাই মুহম্মদ আফজল এবং মেয়ে শায়িস্তার সঙ্গে দেখা করেন অখিলেশ। বলেছেন, আমরা এই ঘটনা নিয়ে কোনওভাবেই রাজনীতি করতে চাই না।

তবে দেখছি উত্তরপ্রদেশে সপা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক ঘটনায় সাম্প্রদায়িক পরিবেশ বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। নিহতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ২০ লাখ থেকে ৩০ লাখ করার কথা ঘোষণা করেন তিনি।

এ ছাড়া ইকলাখের ৩ ভাইকেও দেওয়া হবে ৫ লাখ করে। গত সোমবার রাতের এই ঘটনায় গুরুতর আহত নিহতের এক ছেলে দানিশের চিকিৎসায় সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্ত চলছে। তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি মুখ্যমন্ত্রী। আকলাখের আরেক ছেলে সরতাজ ভারতীয় বায়ুসেনায় কর্তব্যরত। মুখ্যমন্ত্রীকে এদিন ধন্যবাদ জানিয়ে নিহতের ভাই আফজল বলেছেন, আমরা নিশ্চয়ই সুবিচার পাব। যদিও মা আসগরি শনিবারই সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, আমি বিধ্বস্ত। দোষীরা এখনও কেউ গ্রেপ্তার হল না।

এদিকে রবিবার হোমগার্ডের এক কনস্টেবলকে এই ঘটনায় আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। বিনয় নামে এই হোমগার্ডের সঙ্গে নাকি আকলাখের দীর্ঘদিনের বিবাদ ছিল। আকলাখের পরিবারকে আক্রমণ করার জন্য বেশ কয়েকদিন ধরে গ্রামের কিছু যুবককে উসকানি দিচ্ছিল সে। বলছিল, উত্তরপ্রদেশে গোহত্যা নিষিদ্ধ হলেও ওরা গরু খায়, বে আইনিভাবে গরু চালানও করে। শিক্ষা দিতে হবে। সোমবার রাতে বিনয়ই স্থানীয় বিজেপি নেতা সঞ্জয় রানার ছেলে বিশাল রানা এবং বিশালের জেঠতুতো ভাই শিবম রানাকে নিয়ে মন্দিরের পুরোহিতের কাছে যায়। পুরোহিত সুখদাস তখন মন্দিরের দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন। বিনয় বলে গ্রামে গোহত্যা হয়েছে বলে ঘোষণা করে জমায়েত করতে হবে। প্রথমে পুরোহিত রাজি হননি। কিন্তু বিনয় ছিল ইউনিফর্মে। জোর করে পুরোহিতকে দিয়ে নাকি সে ঘোষণা করিয়ে নেয়।

এর পর গ্রামবাসীরা মন্দিরে এলে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতাও করে সে। প্রথমে কয়েকজন যুবককে আকলাখের বাড়িতে পাঠানো হয়। সকলে বাড়িতে আছে কিনা দেখার জন্য। তার পরে প্রায় শ’খানেক গ্রামবাসী চড়াও হয় তাদের বাড়িতে। আকলাখ এবং তার ছেলে দানিশকে হিঁচড়ে টেনে বের করে বেধড়ক মারতে থাকে। প্রথমে স্থানীয় বি জে পি সাংসদ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মহেশ শর্মা একে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে চালাতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই উদ্যোগ হালে পানি পাচ্ছে না দেখে পাল্টা আক্রমণের রাস্তাই শ্রেয় মনে করছে বিজেপি। সূত্র: আনন্দবাজার ও আজকাল।

আরও পড়ুন