বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বিএনপির একের পর এক শুধুই পরিকল্পনা

BNP_সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার আগে থেকেই ‌’দল গোছাতে’ একের পর এক পরিকল্পনা বিএনপি করছে- এমনটি বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এবার খালেদা জিয়া লন্ডনে বসেও দল গোছানোর পরিকল্পনাও নাকি করছেন, সূত্র এমনটিই দাবি করছে। ঢাকাতেও বিএনপির সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এবার হয়তো দলটি গোছানো যাবে!

সূত্রের খবর, দল পরিচালনায় আমূল পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা করছে বিএনপি। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি এবং নেতাকর্মীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে নানা পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে দলটি। হাইকমান্ড থেকে সাংগঠনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণেরও চিন্তাভাবনা রয়েছে। সাংগঠনিক বিষয়গুলো দেখভাল করার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হবে একাধিক কমিটি।

ওইসব কমিটিকে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হতে পারে। হাইকমান্ডের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে নেতাকর্মীরা বাধ্য থাকবেন। শুধু তাই নয়, কোনো কারণে মহাসচিবের অনুপস্থিতিতে যাতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা না আসে সেদিকেও নজর দেয়া হচ্ছে। মহাসচিবের অনুপস্থিতিতে যাকে দায়িত্ব দেয়া হবে, তাকে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাও দেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশে ফিরে আসার পর দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে বিএনপির নীতি-নির্ধারণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, বিগত আন্দোলনের পর দল পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে নেতাদের পরামর্শ জানতে চান খালেদা জিয়া। দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতা এমনকি বিএনপি সমর্থিত কয়েকজন বুদ্ধিজীবী এ ব্যাপারে লিখিতভাবে বেশ কিছু পরামর্শ দেন। ওইসব পরামর্শে ওঠে আসে এসব পরিকল্পনা। সংশ্লিষ্ট এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, পরামর্শগুলো নিয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অনানুষ্ঠানিকভাবে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা ও দল সমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। ওই আলোচনায় সাংগঠনিক বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি ওঠে আসে। এতে ইতিবাচক সাড়া দেন খালেদা জিয়া।

১৬ সেপ্টেম্বর লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। সেখানে তিনি ছেলে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাসায় অবস্থান করছেন। দল পরিচালনাসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে তারা খোলামেলা আলোচনা করছেন। এদিকে লন্ডনে সফররত দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতার সঙ্গে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও নেতাকর্মীদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে চেয়ারপারসনের কথায় মনে হয়েছে। ভবিষ্যৎ দল পরিচালনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসছে এটা মোটামুটি নিশ্চিত বলা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি, স্থায়ী কমিটি ও উপদেষ্টা কমিটিতে শত শত নেতা থাকলেও বাস্তবে তাদের কোনো কাজ নেই। বড় বড় পদ নিয়ে তারা কর্মহীন হয়ে বসে আছেন। ঘুরেফিরে হাতেগোনা কয়েকজন নেতাই দলের সার্বিক বিষয় দেখভাল করে থাকেন। এ নিয়ে সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন সময় নানা ক্ষোভ ও হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে না পেরে অভিমান করে অনেকেই ইতিমধ্যে রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিশাল বহরের কেন্দ্রীয় কমিটি থাকার পরও দলের প্রয়োজনে তা কোনো কাজে আসছে না।

সূত্র জানায়, সিনিয়র নেতাদের কাজে লাগানোর পাশাপাশি দলে গতি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। সাংগঠনিকভাবে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানই হচ্ছেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এ দু’জনের বাইরে একমাত্র মহাসচিবই দলের সাংগঠনিক বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখেন। মহাসচিবের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো কমিটিই অনুমোদন হয় না। এমনকি দলের ফান্ডের টাকা তোলার জন্যও মহাসচিবের স্বাক্ষর লাগে। কোনো কারণে মহাসচিব অসুস্থ থাকলে, গ্রেফতার হলে এসব কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে আসে। তাই কোনো কারণে মহাসচিব অনুপস্থিত থাকলে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যাতে কোনো স্থবিরতা না আসে সেজন্য একজনকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হবে। চেয়ারপারসনের অনুমতি নিয়ে ওই নেতা সাংগঠনিক যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এমনকি কমিটি অনুমোদন বা টাকা-পয়সা লেনদেনের ক্ষমতাও তাকে দেয়া হবে।

সূত্র জানায়, তৃণমূলে গতি ও জবাবদিহিতা আনতেও নেয়া হচ্ছে নানামুখী পরিকল্পনা। সারা দেশে তৃণমূলের কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে কয়েকটি কমিটি করা হবে। তারা সরেজমিন জেলায় জেলায় গিয়ে সাংগঠনিক চিত্র তুলে এনে হাইকমান্ডের কাছে রিপোর্ট করবেন। এদের পাশাপাশি যেসব সিনিয়র নেতা শারীরিক দুর্বলতার কারণে ঢাকার বাইরে যেতে পারবেন না, তাদেরও দলীয় কাজে সক্রিয় করা হবে। এদের একটি অংশকে ঢাকায় বসে তৃণমূলের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে। বিভিন্ন সময় যারা অঙ্গসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বা এর সঙ্গে জড়িত তাদের অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের দেখভাল করার দায়িত্ব দেয়া হবে। একজন সিনিয়র নেতার নেতৃত্বে ওই কমিটি দলের সবক’টি অঙ্গসংগঠনের সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করবেন। এমনকি নতুন কমিটি করার ক্ষেত্রে তাদের সুপ্রিম ক্ষমতা দেয়া হবে। চেয়ারপারসনের সঙ্গে পরামর্শ করে অঙ্গসংগঠনের ব্যাপারে তারা যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। অঙ্গসংগঠনের নেতারা তাদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ওই কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন।

সূত্র জানায়, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য আলাদা কোনো উইং নেই। দলের মুখপাত্র বা সিনিয়র কোনো নেতা নির্দিষ্ট বিষয়ে কিছু না জেনেই অনেক সময় মন্তব্য করে বসেন। এ নিয়ে পুরো দলকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। ফলে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর চিন্তা দলটির হাইকমান্ডের। তাদের মতে, দলের সিনিয়র নেতা যারা নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ তাদের সঙ্গে দল সমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে বিষয়ভিত্তিক কমিটি করা হবে। তারা সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে গবেষণা করবেন। সর্বশেষ অগ্রগতি দলের হাইকমান্ডকে অবহিত করবেন। সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ছাড়া নির্দিষ্ট বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরবে ওইসব কমিটি।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, কিভাবে দলকে আরও গতিশীল ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সিনিয়র নেতা ও বিএনপি সমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শও নেয়া হয়েছে। দলের চেয়ারপারসন সবার সঙ্গে আলোচনা করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

জানতে চাইলে বিএনপি সমর্থিত অন্যতম বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, দল পরিচালনায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে এর আগেও আমরা চেয়ারপারসনকে পরামর্শ দিয়েছি। সাংগঠনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে দলে গতিশীলতা ও জবাবদিহিতা আসবে বলে মনে করি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বলতে গেলে তিনি একাই দল পরিচালনা করে আসছেন। এর মধ্যে তার এক ছেলে মারা যাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েন। বড় ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি লন্ডনে গেছেন। এর ফলে তিনি মানসিকভাবে চাঙ্গা হবেন। দেশে ফিরে ফ্রেশ মাইন্ড নিয়ে নতুন ভাবনা-চিন্তাগুলো সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। আর সাংগঠনিক কাজগুলো সিনিয়র নেতাদের মধ্যে ভাগ করে দিলে চেয়ারপারসনের ওপর চাপ কিছুটা কমবে।

আরও পড়ুন