বাংলাদেশের শেয়ারবাজার আবার লুটেরাদের কবলে পড়েছে। এবার নীরবে পুুঁজি হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি। গত ৬ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে মূল্যসূচক কমেছে ১২৮ পয়েন্ট। কমছে লেনদেনও।
অর্থনীতিবিদ এবং শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের এই অস্বাভাবিক পতনের কয়েকটি কারণ রয়েছে। গ্রামীণফোনসহ বড় কয়েকটি কোম্পানির টানা দরপতনের কারণে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আতংকে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। এছাড়া কয়েকটি ব্যাংক তাদের অতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয় করছে।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ১২ দেশের নতুন অর্থনৈতিক জোট ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রফতানিমুখী যেসব প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত তাদের আয় কমতে পারে। এছাড়াও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও অস্থির হওয়ার আশংকা করছে কেউ কেউ। সব কিছু মিলে শেয়ারবাজারে দুঃসময় যাচ্ছে।
সার্বিক বাজার পরিস্থিতি : গত ১ অক্টোবর ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। রোববার পর্যন্ত তা কমে ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এ হিসেবে ৬ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রোববার একদিনেই কমেছে ৩ হাজার কোটি টাকা।
আলোচ্য সময়ে অর্থাৎ ৬ কার্যদিবসে ডিএসইর মূল্যসূচক ৪ হাজার ৮৫৬ পয়েন্ট থেকে কমে ৪ হাজার ৭২৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এছাড়া গড় লেনদেন ৫শ কোটি টাকা থেকে কমে ৩শ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় লেনদেনের শুরুতেই রোববার শেয়ারাবাজারে দরপতন শুরু হয়। প্রথম আড়াই ঘণ্টায় প্রায় ৮৫ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারের দরপতন হয়। ফলে ডিএসইর সূচক ৮০ পয়েন্ট কমে যায়। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সূচক ১৫০ পয়েন্ট কমেছিল। তবে শেষ দেড় ঘণ্টায় বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাপোর্ট পতন কিছুটা কমে আসে। দিনশেষে ডিএসই সূচক পতন ৫৩ পয়েন্ট কমেছে। আর সিএসইর কমেছে ১০৮ পয়েন্ট।
শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, গ্রামীণফোন, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট এবং মবিল যমুনার মতো বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম টানা কমছে।
এতে অন্য কোম্পানিগুলোরও দর পতন হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইসিবির একজন কর্মকর্তা জানান, বাজারে বড় স্টেকহোল্ডার গ্রামীণফোন। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে প্রতিষ্ঠানটির ৩ দশমিক ০৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। আর গত ৬ মাসে প্রতিষ্ঠানটির আয় ১০ কোটি টাকা কমেছে। এতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, দেশের পরিস্থিতি খুব একটা বেশি ভালো নয়। বিদেশী নাগরিক হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর নিয়ে দেশ অস্থির হওয়ার আশংকা রয়েছে। ফলে সচেতন বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে সাইট লাইনে চলে যাচ্ছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে টিপিপি চুক্তি হওয়ায় গার্মেন্ট খাতের কোম্পানিগুলোর জন্য নেতিবাচক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। এ বিষয়গুলো বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগ : শেয়ারবাজারে বতর্মানে ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগ ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিনিয়োগ সমন্বয়ের সর্বশেষ সীমা ২০১৬ সালের ২১ জুন। এ কারণে ব্যাংকগুলো চাপে শেয়ার বিক্রি করছে। ফলে সমন্বয়ের মেয়াদ না বাড়লে শেয়ারবাজার আরও খারাপ হবে। বাজারের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই সীমা আরও ৪ বছর বাড়াতে ডিএসই এবং মার্চেন্ট ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনে শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ছিল মোট দায়ের ১০ শতাংশ। কিন্তু ২০১০ সালে ব্যাংকগুলো এই সীমা অতিক্রম করে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশ হস্তক্ষেপে ব্যাংকের বিনিয়োগ কমিয়ে আনা হলে শেয়ারবাজারে বিপর্যয় হয়।
এরপর ২০১৩ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে ব্যাংকের বিনিয়োগ ইক্যুইটির ২৫ শতাংশ করা হয়। আর ইক্যুইটির মধ্যে রয়েছে পরিশোধিত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম, সংবিধিবদ্ধ রিজার্ভ এবং অবন্টিত মুনাফা। এতে আগে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা ১ হাজার কোটি টাকা থাকলে বর্তমানে তা ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
আর অতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয়ের মেয়াদ ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত বেঁধে দেয়া হয়। এ কারণে বিনিয়োগ সমন্বয়ে ব্যাংকগুলো চাপে রয়েছে। প্রতিদিনই ফোর্সড সেল (বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি) করতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের অভিমত : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, পতনের কারণটি স্পষ্ট নয়। হঠাৎ করে দরপতনের মতো পারিপার্শ্বিক কোনো অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। তবে দেশের বিনিয়োগকারীরা এখনও হুজগে শেয়ার বেচাকেনা করে। এছাড়া বাজারে কারসাজির জন্য একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রকসংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে খতিয়ে দেখতে হবে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের দরপতন অপ্রত্যাশিত। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এখানে অনেক বেশি। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জাপানি ও ইতালির নাগরিকের হত্যার কারণে বাজারে প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া বিদেশী ক্রেতারাও পোশাক খাতের অর্ডার বাতিল করছে। বিষয়টি নেতিবাচক। তবে তিনি মনে করেন আইসিবিসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাপোর্ট দিলে বাজার এই অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।


