তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। আপাতত কম সুদের আশায় উদ্যোক্তারা দেদার আনছেন বৈদেশিক ঋণ। এতে ব্যাংক আমানতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে ঋণের সুদহার কমিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি তহবিল ব্যবস্থাপনাব্যয় কমাতে ব্যাংকগুলোয় কমানো হচ্ছে আমানতের হার। আর এতে ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানতের সুদের ব্যবধান (¯প্রড বা মুনাফা) কমে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যবসায় মন্দার কারণে ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। এতে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এক দিকে ¯েপ্রড কমে যাওয়ায় মুনাফা কমছে, অপর দিকে খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে বেশি। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তহবিল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও এ অর্থের বেশির ভাগই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জোগান দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানতের অনুপাত কমে নেমেছে ৬৯ ভাগে। অর্থাৎ ব্যাংক ১০০ টাকা আমানত নিয়ে বিনিয়োগ করতে পেরেছে মাত্র ৬৯ টাকা। অথচ এ সময়ে দেশীয় উদ্যোক্তারা বৈদেশিক ঋণ এনেছে ৮০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ টাকার অঙ্কে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। দেশীয় উদ্যোক্তারা বৈদেশিক ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়ায় মূলত ব্যাংকের বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।
জানা গেছে, দুইভাবে উদ্যোক্তারা বৈদেশিক ঋণ আনছেন। প্রথমত, বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে পাঁচ বছর থেকে সাত বছর মেয়াদে অপেক্ষাকৃত কম সুদে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে সরাসরি বৈদেশিক ঋণ আনছে। দ্বিতীয়ত, অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক ঋণ ঢুকছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের কাছে বৈদেশিক ঋণ এসেছে ৩১ হাজার কোটি টাকা মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এতে তারা বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। প্রথমত, দেশীয় উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে বৈদেশিক ঋণ পাচ্ছেন, সেখানে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদহার হলো সর্বনিম্ন সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের অভ্যন্তরীণ ঋণে আকৃষ্ট করতে বাধ্য হয়ে ঋণের সুদহার কমাতে হচ্ছে। আর ঋণের সুদহার কমানোর পাশাপাশি আমানতের সুদহারও কমাতে হচ্ছে। এর ফলে সুদের ব্যাপ্তি বা ¯েপ্রড কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগে যেখানে ১০০ টাকা আমানত নিতে কোনো কোনো ব্যাংকের সর্বোচ্চ ১৪ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে, বর্তমানে তা সর্বোচ্চ সাড়ে ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এতে দুই ধরনের সমস্যায় পড়ছেন তারা। এক দিকে আমানতের সুদহার কমিয়ে দেয়ায় আমানতকারীরা নতুন করে ব্যাংকে আমানত রাখা কমিয়ে দিয়েছেন। উপরন্তু কেউ কেউ ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিচ্ছেন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সঙ্কটে পড়ার তারা আশঙ্কা করছেন। দ্বিতীয়ত, ঋণের সুদহার কমিয়েও ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারছে না। উদ্যোক্তা পেতে সর্বোচ্চ ছাড় দিতে হচ্ছে। এতে বেশির ভাগ ব্যাংকেরই উদ্বৃত্ত তহবিল থাকছে। বিনিয়োগযোগ্য তহবিল পড়ে থাকায় ব্যাংকের বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাচ্ছে।
কেননা, শর্তানুযায়ী আমানতকারীদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সুদাসলে পরিশোধ করতে হয় ব্যাংকের। কিন্তু আমানতকারীদের অর্থ বিনিয়োগ করতে না পারলে অর্থাৎ অলস পড়ে থাকলে নিট আয় কমে যায়। এভাবে নিট আয় অব্যাহতভাবে কমে গেলে একপর্যায়ে লোকসানের সম্মুখীন হয় ব্যাংক। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।
এ দিকে ঋণের সুদ কমছে, কমছে ব্যাংকের বিনিয়োগ, কিন্তু খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থেকে বের হতে পারছে না ব্যাংকগুলো। যদিও নানা উপায়ে ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতায় কৃত্রিমভাবে কমানো হচ্ছে খেলাপি ঋণের হার। এতে প্রকৃত আদায় কমে যাচ্ছে ব্যাংকগুলের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, ব্যবসায়-বাণিজ্য মন্দার দোহাই দিয়ে উদ্যোক্তারা অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন না। আর এতে সহযোগিতা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কতগুলো উদ্যোগের কারণে।
যেমন, গত ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যেকোনো উপায়ে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয় ব্যাংকগুলোকে। ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের ডেকে মৌখিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ নির্দেশ দেয়া হয়। বছর শেষ হওয়ার মাত্র ১৫ দিন আগে এ নির্দেশ পেয়ে কোনো কোনো ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ছুটির দিনেও পর্ষদের বৈঠক ডেকে ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়। এটা এখনো চলছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার ব্যাংকের একটি খেলাপি ঋণ নবায়ন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ৯ কোটি টাকা ব্যাংকের ডাউন পেমেন্ট দেয়ার কথা।
সেখানে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে ব্যাংককে মাত্র ২০ লাখ টাকা দিয়ে খেলাপি ঋণ নবায়ন করে নেন। এভাবে তাদের প্রকৃত আদায় কমে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণ না কমায় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে বেশি। এক দিকে আয় কমছে, অপর দিকে খেলাপি ঋণ না কমায় এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে আগের মতো। যেহেতু প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে, এ কারণে প্রকৃত মুনাফা আরো কমে যাচ্ছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বেশির ভাগ ব্যাংকের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, শুধু দেশের ব্যাংকিং খাতকেই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে না, দেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে যেসব ঋণ নিচ্ছেন ওইসব ঋণের সুদ আপাতত কম হলেও কার্যকর হার অনেক বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেননা, বিদেশী মুদ্রায় নেয়া এসব ঋণ টাকায় ব্যয় হবে। কিন্তু পরিশোধ করতে হবে বিদেশী মুদ্রায়। এতে একপর্যায়ে চাপ বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যেসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করার জন্য ঋণ নেয়া হচ্ছে এসব প্রকল্প থেকে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে বিদেশী মুদ্রা আসবে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দায় বাড়বে দেশের ওপর।
বাজারবিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বিদেশী ঋণের সুদ আপাতত কম মনে হলেও কার্যকর হার আরো বেড়ে যাবে। যেমন একজন বিনিয়োগকারী বিদেশ থেকে ৬ শতাংশ হারে ১০০ কোটি ডলার (৭৯ টাকা ১০ পয়সা প্রতি ডলার হিসেবে) ঋণ গ্রহণ করলেন। এক বছর পর প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হলে প্রতি ডলারে টাকার মান কমে প্রায় ৭ শতাংশ। যেহেতু ডলারে ঋণ করে টাকায় ব্যয় করলেও ডলারে পরিশোধ করায় বিনিময় হারের কারণে সুদব্যয় বেড়ে হবে (৬+৭) সোয়া ১৩ শতাংশ । এভাবে কেউ ৫ বা ১০ বছর মেয়াদি বিদেশী ঋণ নিলে কার্যকর হার অনেক বেড়ে যাবে।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিনিয়োগচাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স ও রফতানির মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা পাচ্ছে তা কাজে লাগাতে পারছে না। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করছে। এতে ডলারের মানও অনেকটা সহনীয় রয়েছে। কিন্তু সামনে বিনিয়োগচাহিদা বাড়লে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাবে। আর চাহিদা বেড়ে গেলে ডলারের মানও বেড়ে যাবে। তখন স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিদেশী ঋণ পরিশোধ করতে কার্যকর হারও বেড়ে যাবে, যা এক সময় দেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।


