বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়কে আধুনিক এবং প্রযুক্তি নির্ভর কর্পোরেট স্টাইলে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে একটি অর্গানোগ্রামের খসড়া। উন্নত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল ও সরকার প্রধানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের আলোকে এ খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিশেষ বলয়মুক্ত করে কীভাবে আরও নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার কাছাকাছি নেয়া যায় তারও একটি ছক তৈরি করা হয়েছে। এতে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক সচিব পদও সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনে বিএনপি চেয়ারপারসনের বর্তমান কার্যালয়কে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ারও চিন্তা-ভাবনা করছেন দলটি নীতি-নির্ধারকরা।
প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামের খসড়ায় বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়কে অন্তত সাত ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিভাগ, মিডিয়া বিভাগ, সিভিল সোসাইটি বিভাগ, জনসংযোগ বিভাগ, আন্তর্জাতিক বিভাগ, তথ্য ও গবেষণা বিভাগ এবং আইটি বিভাগ। প্রতিটি বিভাগে একজন করে বিভাগীয় প্রধান থাকবেন যার পদবি হবে পরিচালক এবং তার অধীনে একাধিক দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি থাকবেন। প্রতিটি বিভাগেরই কাজ ভাগ করে দেয়া আছে। সে অনুযায়ী কাজ চলবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিভাগের কাজ হবে কার্যালয় পরিচালনার পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসনের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। মিডিয়া বিভাগে একজন পরিচালক ছাড়াও একজন প্রেস সচিব ও সহকারী প্রেস সচিব থাকবেন। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের সম্পর্ক তৈরি এবং দল পরিচালনায় তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের আয়োজন করবে সিভিল সোসাইটি বিভাগ। জনসংযোগ বিভাগের কাজই হবে বিএনপি চেয়ারপারসনের পক্ষে দলের বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রচার চালানো। এছাড়া বিশ্ব রাজনীতির দিকে নজর রেখে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে নতুন নতুন উদ্যোগ নেবে আন্তর্জাতিক বিভাগ। তথ্য ও গবেষণা বিভাগ ইতিহাস-রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা করবে। আইটি বিভাগ ইউনিয়ন থেকে শুরু করে সারা দেশের নেতাকর্মীদের নাম ও পদবিসহ তাদের যাবতীয় তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করবে। পাশাপাশি দলের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় রক্ষণাবেক্ষণও করবে এই বিভাগ। দলের ওয়েবসাইটটিও এ বিভাগের অধীনে থাকবে। দলীয় কার্যক্রমের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হবে এ ওয়েবসাইটে। আইটি এবং তথ্য ও গবেষণা বিভাগ কার্যালয়ের বাইরে রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে।
দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপিপন্থী কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও দলের কয়েকজন নেতা খালেদা জিয়ার কাছ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে চেয়ারপারসনের কার্যালয়কে আধুনিক মানের করতে একটি অর্গানোগ্রামের খসড়া তৈরি করেন। দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের কাজ শেষ করে ৬০ পৃষ্ঠার খসড়াটি (ভিডিও ও স্থিরচিত্রসহ) খালেদা জিয়ার কাছে জমা দেন। যার অংশ বিশেষ প্রজেক্টরের মাধ্যমে গুলশান কার্যালয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। ওই খসড়াটি খালেদা জিয়া যুক্তরাজ্যে নিয়ে গেছেন। সেখানে তারেক রহমানের সঙ্গে আলাপ করে পুরো বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।
জানতে চাইলে নতুন অর্গানোগ্রাম তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আগামীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়কে আধুনিক মানের কার্যালয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দক্ষ ও লোকবল নিয়োগ দেয়া হবে। যারা এখন আছেন তাদের একটি সিস্টেমের মধ্যে আনা হবে। সেক্ষেত্রে যারা আছেন তাদের বাদ পড়ার সম্ভাবনা কম।
তবে খালেদা জিয়ার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারপারসনের কার্যালয়কে যেভাবে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে যারা বর্তমানে আছেন তাদের অনেকেই বাদ পড়তে পারেন। কারণ এখন যারা আছেন তারা অনেকেই নিরপেক্ষ নন। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। এসব বিতর্কিত লোককে সরিয়ে সেখানে দলের প্রতি আনুগত্য, আস্থাশীল এবং দক্ষ ও ক্লিন ইমেজের লোকদেরই নিয়োগ দেয়া হতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর।
খালেদা জিয়ার কাছে জমা দেয়া প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো বলয় মুক্ত করে খালেদা জিয়াকে নেতাকর্মীদের আরও কাছাকাছি নিতে একটি ছক করা হয়েছে। এতে তৃণমূল নেতাকর্মীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেলার কেন্দ্রীয় নেতাদের যোগাযোগ বাড়াতে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
সপ্তাহে এক বা দুই দিন জেলার নেতাদের সঙ্গে চেয়ারপারসনের সাক্ষাতের বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি মহাসচিবের একটি কক্ষ এবং তার একজন রাজনৈতিক সচিব রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
বর্তমান গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার কক্ষ ছাড়া দলের সিনিয়র নেতাদের বসার জন্য অন্য কোনো কক্ষ নেই। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে মহাসচিবের কক্ষ থাকলে নেতারা কার্যালয়ে আসতে স্বস্তি বোধ করবেন।


