বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

পে স্কেল ও ১৭ দপ্তর স্থানান্তর: প্রশাসনে নয়া অসন্তোষ

UNO-অষ্টম পে স্কেলের কাঠামোতে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিল করায় বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু অসন্তোষ আগেই ছিল। এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে উপজেলা পরিষদে ন্যস্ত ১৭ দফতরের অফিসারদের বেতন-ভাতা বিলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) স্বাক্ষরের আদেশ। এ প্রেক্ষাপটে সরকারি প্রশাসনের সর্বশেষ স্তরের (উপজেলা) কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ জমছে। তারা আন্দোলনও শুরু করেছেন।

এমনিতেই অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ রয়েছে, বদলী পদোন্নতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা তাদের বঞ্চিত করছেন। ইউএনও-র স্বাক্ষরের আদেশ সামনে রেখে পুরনো ক্ষোভও দানা বাঁধছে বলে জানা গেছে। ফলে সরকার এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলা পরিষদের কাছে ১৭ দফতর হস্তান্তরের বিষয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গত ১৪ অক্টোবর একটি অফিস স্মারক জারি করা হয়। এতে বলা হয়, ‘উপজেলা পরিষদে ন্যস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের হিসাব এবং উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হিসাব উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউএনও-র স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে।’

এ ছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত প্রকল্পের অনুদানের অর্থ ও মন্ত্রণালয়/বিভাগের আনুষঙ্গিক কার্যাবলীর প্রয়োজনীয় অর্থের হিসাব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দফতর প্রধানের যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে বলেও ওই আদেশে বলা হয়েছে।

কিন্তু ১৭ দফতরের হস্তান্তর প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরই এর বিরোধিতা শুরু করেন ২৬টি ক্যাডার এ্যাসোসিয়েশন ও অন্যান্য সার্ভিসের সংগঠন বিসিএস সমন্বয় কমিটি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আদেশ জারির পর তা আরও জোরাল হচ্ছে।

সংগঠনের নেতারা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ের ১৭টি সার্ভিসের সেলফ ড্রয়িং (নিজ স্বাক্ষরে বেতন উঠানো) কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বিলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত কর্মকর্তাদের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক ও অবমাননাকর। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রাণী-সম্পদ কর্মকর্তাসহ অনেক কর্মকর্তা ইউএনও-র চেয়ে সিনিয়র।

তারা আরও জানান, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধানে চাকরি করার ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু এক সার্ভিসের কর্মকর্তাকে অন্য সার্ভিসের কর্মকর্তার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ চাকরিবিধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক মানসিকতা থেকে অন্য সার্ভিসের কর্মকর্তাদের খবরদারি করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।

পরবর্তী সময়ে এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয় প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসকদের সংগঠন প্রকৃচি। গঠিত হয় ‘প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি’। বুধবারে সংগঠনের নেতারা জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেন।

ইতোমধ্যে বরিশালের আগৈলঝাড়া, সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী, ফরিদপুরের বোয়ালমারীসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলায় ১৬ দফতরের কর্মকর্তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আদেশের বিরোধিতা করে মানববন্ধন করেছেন।

আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিএস সমন্বয় কমিটির সভাপতি কবির আহমেদ ভূইয়া বলেন, ‘আন্দোলন নয়, এটা আমাদের যৌক্তিক দাবি। এগুলো খুবই নগণ্য। ২৩ অক্টোবর আলোচনা করে আগামী ২৪ অক্টোবর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের সামনে সমাবেশে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৮ অক্টোবর অর্থমন্ত্রীর আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা ছিল, কিন্তু তিনি বসলেন না। সারাদেশের অফিসারদের একটা অন্তোষের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হল। দাবি আদায় না হলে তো আমাদের কর্মসূচিতে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে। এটি আরও এগিয়ে যাবে।’
‘উপজেলাকে কার্যকর করার নামে ইউএনওকে ৯৮ ভাগ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যানকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২ ভাগ ক্ষমতা। এটা উপনিবেশিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে কীভাবে উপজেলা পরিষদ কার্যকর হবে?’ প্রশ্ন তোলেন কবির আহমেদ।

প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে কবির আহমেদ ভূইয়া বলেন, ‘প্রশাসন ক্যাডারের আচার-আচরণে মনে হয় আমরা আবার ব্রিটিশ আমলে চলে যাচ্ছি। আমাদের সবাইকে একটি ক্যাডারের অধীনে কাজ করতে হবে।’

জারি করা আদেশটির বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ আইন ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আদেশটি জারি করা হয়েছে। এটা কেউ আমাদের ধমক দিয়ে জারি করেনি, আমরা কোনো আনরেস্ট (অসন্তোষ) দেখে এটা জারি করিনি। আমরা বিক্ষোভ, প্রতিবাদ এ-সব পত্রিকায় দেখে তো কাজ করি না। আমরা বিধি-বিধান দেখে কাজ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাজেই আমাদের আইন ও বিধি-বিধান জানতে হবে। কারা আনরেস্ট করছে জানি না, তাদেরও এগুলো জানা দরকার আছে। আমরা তো গভর্নমেন্টের এমপ্লয়ি, কর্মচারী তো আমরা। কর্মচারীরা কীভাবে মালিকের সঙ্গে কথা বলবেন এটাও কিন্তু আইন-কানুনে বলা আছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ আইনেই উপজেলায় ইউএনওকে মুখ্য কর্মকর্তা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে বিসিএস সমন্বয় পরিষদের প্রচার সম্পাদক স ম গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘মুখ্য কর্মকর্তা মানে তো বেতন-বিলে স্বাক্ষর করা নয়। অন্য ১৬ দফতরের মতো তিনি (ইউএনও) নিজেও তো উপজেলা পরিষদে হস্তান্তরিত। মুখ্য কর্মকর্তা হিসেবে ইউএনও সমন্বয় ও তদারকি করতে পারেন।’

বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব মো. ফিরোজ খান বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে উপজেলা পরিষদকে অধিকতর কার্যকর করার নামে পেশাদার ও কারিগরীসহ উন্নয়নমুখী দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা উত্তোলন, প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও তদরকিসহ সকল ক্ষেত্রে ইউএনও-র অযৌক্তিক ও অযাচিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত দেশের দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য চরম অবমাননাকর। ফলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।’

ইউএনওসহ ন্যস্ত দফতরের কর্মকর্তাদের উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে জবাবদিহি ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়ে ফিরোজ খান বলেন, ‘একজন জুনিয়র কর্মকর্তা (ইউএনও) দিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ সরকারের প্রশাসনিক রীতির পরিপন্থী। এ ছাড়া ন্যস্ত কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বিল অন্য বিভাগের কর্মকর্তার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা দেশের ফিন্যান্সিয়াল রুলের পরিপন্থী।’

টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বহালের দাবি জানিয়ে সদস্য সচিব বলেন, ‘নতুন বেতন স্কেলে অনুযায়ী পদোন্নতি না পাওয় একজন কর্মকর্তাকে ক্ষেত্র বিশেষে পরবর্তী স্কেলে উন্নীত হতে ১৮ বছর লেগে যাবে। এতে স্বাভাবিকভাবেই কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশার জন্ম হবে ও স্বাভাবিকভাবেই কর্মক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন না।’

১৩ মন্ত্রণালয়ের ১৭ দফতর : গত ৩১ আগস্ট ‘উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮’ অনুযায়ী পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত ১৩ মন্ত্রণালয়ের ১৭ দফতরের জনবলের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ বাবদ সরকারের দেওয়া অর্থ পরিষদের তহবিলে জমার প্রস্তাব অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এ দফতরগুলোর মধ্যে রয়েছে— উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দফতর, স্বাস্থ্য অধিদফতর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, মৎস্য অধিদফতর, প্রাণী-সম্পদ অধিদফতর, ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদফতর, সমাজসেবা অধিদফতর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর, মহিলা বিষয়ক অধিদফতর, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, সমবায় অধিদফতর, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, বন অধিদফতর এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর।

আরও পড়ুন