ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সব মিলিয়ে চিকিৎসকের সংখ্যা ২০। তবে বৃহস্পতিবার তাঁদের মধ্যে ১৮ জনই হাসপাতালে ছিলেন না। তাঁরা সবাই ছুটি নিয়ে গত বুধবার কক্সবাজার বেড়াতে গেছেন, ফিরবেন আগামী রবিবার। পরিবারের সদস্যরাও তাঁদের সঙ্গে রয়েছে। তবে সপরিবারে বেড়ানোর জন্য নিজেদের পকেট থেকে কোনো টাকা খরচ করেননি এই চিকিৎসকরা। পুরো টাকাই তাঁরা আদায় করেছেন বিভিন্ন ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধির (এমআর) কাছ থেকে।
কোনো কম্পানির প্রতিনিধি টাকা না দিলে চিকিৎসকরা রোগীর প্রেসক্রিপশনে আর ওই কম্পানির ওষুধ সুপারিশ করবেন না বলে হুমকি দিয়েছিলেন। এভাবে জোর-জবরদস্তি করে ১০টি ওষুধ কম্পানির কাছ থেকে তিন লাখ টাকারও বেশি আদায় করেছেন ওই চিকিৎসকরা। সেই টাকায় একটি বিলাসবহুল বাস ভাড়া করে বুধবার রাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে সরাইল ছাড়েন তাঁরা।
চিকিৎসকদের এভাবে কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার খবর গতকাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল। একসঙ্গে ১৮ জন চিকিৎসক ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করায় চিকিৎসাব্যবস্থায়ও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এ ঘটনায় রোগী, এমআর ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে গতকাল কেবল মেডিক্যাল অফিসার মো. শাহেদ উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার বেগম সরাইলে থাকলেও গতকাল অফিসেই আসেননি। জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক মো. শাহেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, পূজা ও আশুরা উপলক্ষে সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে বর্ধিত ছুটি নিয়ে চিকিৎসকরা বাইরে আছেন। সরকারি ছুটি থাকায় এমনিতেই হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগী দেখা বন্ধ। তিনি (শাহেদ) ও সহকারীরা মিলে জরুরি চিকিৎসা ও ওয়ার্ডের সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিকেল নাগাদ ৩০-৩৫ জনের মতো রোগী চিকিৎসা নিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজার ভ্রমণের পরিকল্পনার পর ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। সেই অনুসারে ওষুধ বিক্রির ক্রম অনুসারে কম্পানিগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির কম্পানির কাছ থেকে ৫০ হাজার, ‘বি’ ক্যাটাগরির কম্পানির কাছ থেকে ৪০ হাজার এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির কম্পানির কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। এভাবে ১০টি কম্পানির কাছ থেকে তিন লাখেরও বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে।
ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে টাকা বুঝে নিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. মশিউর। টাকা নেওয়ার পর সাদা কাগজে ‘বুঝিয়া পাইলাম’ লিখে তিনি সই করেছেন। সইয়ের নিচে তারিখ দেওয়া আছে ১৫ অক্টোবর। ডা. মশিউরের স্ত্রীও এই হাসপাতালের চিকিৎসক। তিনিও ওই দলের সঙ্গে কক্সবাজার গেছেন।
ছুটিতে থাকা ১৮ জনের মধ্যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. নোমান মিয়াও রয়েছেন। ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার পর তিনি সব চিকিৎসকের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কম্পানিগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে গত ১৫ অক্টোবর একটি চিঠি লিখেছেন। কম্পানির ব্যবস্থাপকদের কাছে ইংরেজিতে লেখা চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সব চিকিৎসক ২১ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজার ভ্রমণে যাচ্ছেন। আপনাদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ। আশা করছি, সহযোগিতার এ ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’
১৮ জন চিকিৎসকের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের সদস্য আছে ২০-২২ জন। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ জন সাকুরা পরিবহনের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল কোচে করে সরাইল ছেড়েছে।
ওষুধ কম্পানিগুলোর একাধিক বিক্রয় প্রতিনিধি নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘ডাক্তারদের ভ্রমণের জন্য অনেকটা জোর করেই আমাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়েছে। টাকা না দিলে সংশ্লিষ্ট কম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লেখা হবে না বলেও আমাদের হুমকি দেওয়া হয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, ‘ডাক্তাররা এ কাজটি ভালো করেননি। অনেকের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করা হয়েছে। চাঁদা আদায়ের মতো করে টাকা দেওয়ার জন্য সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়। আমরা কর্মচারী বিধায় এ নিয়ে কিছু বলারও সাহস নাই।’
এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল দুপুরে আরএমও ডা. নোমান মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। একপর্যায়ে তিনি মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দেন। সন্ধ্যার পর ফোন চালু পাওয়া গেলেও তিনি আর ফোন ধরেননি। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসিনা আক্তার বেগমের মোবাইল ফোনও সারা দিন বন্ধ ছিল। সন্ধ্যার পরও একাধিকবার চেষ্টা করা হয়েছে, তবে তিনি ফোন চালু করেননি।
চিকিৎসকরা এভাবে ছুটি নিতে পারেন কি না, তা জানতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেকটি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী সরকারি ছুটি থাকলেও চিকিৎসকদের কেউ চাকরিস্থল ছেড়ে যেতে পারেন না। আর তাঁরা ছুটি নিলেও একসঙ্গে এতজনের ছুটি কিভাবে মঞ্জুর হলো তা বুঝতে পারছি না। এমআরদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভ্রমণে যাওয়া মোটেও ঠিক হয়নি।’
যোগাযোগ করলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন হাসিনা আকতার গতকাল বিকেলে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘চিকিৎসকরা কোথায় গেছেন, ছুটি নিয়েছেন কি না কিংবা কিভাবে ছুটি পেলেন, এসব বিষয়ে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাই ভালো বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চিকিৎসকদের ভ্রমণে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বিস্তারিত না জেনে আমি কোনো ধরনের মন্তব্য করব না।’ ছুটির দিনে চিকিৎসকরা হাসপাতালে নাও থাকতে পারেন, এমন কথা বলে তিনি উল্টো জানতে চান, হাসপাতাল একেবারে খালি কি না।
সূত্র: কালেরকণ্ঠ



